
কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন। দলও ১-১ গোলে ড্র করায় সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হচ্ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। প্রশ্ন উঠেছিল তার একাদশে থাকা নিয়ে। তবে ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা ভালো করেই জানেন কীভাবে জবাব দিতে হয়—মুখে নয়, মাঠে। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন স্টেডিয়ামে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক তা-ই করলেন সিআর সেভেন। গোলখরা কাটিয়ে করলেন জোড়া গোল, গড়লেন একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড। আর রোনালদোর স্বরূপে ফেরার রাতে পর্তুগাল মেতে উঠল ৫-০ গোলের মহোৎসবে।
দল বড় জিতলেও ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর রোনালদোর মনে হয়তো কিছুটা আক্ষেপ থেকে গেছে। একের পর এক সুযোগ পেয়েও যে ক্যারিয়ারের আরেকটি হ্যাটট্রিক অধরাই থেকে গেল! কখনো নিজের ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতা, আবার কখনো উজবেক গোলরক্ষক আব্দুভোহিদ নেমাতভের দুর্দান্ত সব সেভ বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার হ্যাটট্রিকের সামনে।
ম্যাচের শুরু থেকেই উজবেকিস্তানের ওপর চড়াও হয়ে খেলে পর্তুগাল। ২ মিনিটেই ব্রুনো ফার্নান্দেজের শট ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে কর্নার হলে রক্ষা পায় উজবেকিস্তান। ৪ মিনিটে নুনো মেন্দেসের ক্রস ক্রসবারে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন ৫ বারের ব্যালন ডি'অর জয়ী সিআর সেভেন।
তবে গোল পেতে বেশি সময় লাগেনি। ম্যাচের ৬ষ্ঠ মিনিটে জোয়াও কানসেলোর নিখুঁত ক্রস থেকে এক বুলেট গতির শটে জাল কাঁপান রোনালদো। শটের তীব্রতা যেন সমালোচকদের প্রতি এক নীরব চপেটাঘাত! বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচ পর গোল পেয়ে রোনালদো মেতে ওঠেন তার ট্রেডমার্ক ‘সিউ’ উদযাপনে।
১৭তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নুনো মেন্দেস। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তার দুর্দান্ত ফ্রি-কিকটি উজবেক গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে জড়ায়। ২৯ মিনিটে অবশ্য ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া এক শটে ব্যবধান কমিয়েছিল উজবেকিস্তানের আজিজ ঘানিভ। তবে গোল হওয়ার ঠিক আগে কানসেলোকে ফাউল করায় ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির সাহায্যে গোলটি বাতিল করেন রেফারি।
৩৯তম মিনিটে আবারও জ্বলে ওঠেন রোনালদো। ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে দারুণ এক ফিনিশিংয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে হ্যাটট্রিক করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন, তবে গোলরক্ষককে এগিয়ে আসতে দেখে নেওয়া তার চিপটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ফলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় পর্তুগাল।
বিরতির পর ৫৮ মিনিটে আবারও হ্যাটট্রিকের দোরগোড়ায় ছিলেন রোনালদো। ৩০ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক না নিয়ে বিচক্ষণতার সাথে ডি-বক্সে ঢুকে ফার্নান্দেজের ভলি শট নেন তিনি, তবে তা গোলরক্ষকের পায়ে লেগে কর্নার হয়। সেই কর্নার থেকেই আসে পর্তুগালের চতুর্থ গোল। ফার্নান্দেজের কর্নার কিক ক্লিয়ার করতে গিয়ে উজবেক ডিফেন্ডার আব্দুকাদির খুচানভের শট গোলরক্ষক নেমাতভের গায়ে লেগে নিজেদের জালে জড়িয়ে যায় (আত্মঘাতী)।
৭৪ মিনিটে গোলরক্ষক নেমাতভ গোল কিক নিতে গিয়ে সরাসরি রোনালদোর পায়ে বল তুলে দেন। রোনালদো দূরের পোস্টে শট নিলেও ঝাঁপিয়ে পড়ে তা ঠেকিয়ে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন উজবেক গোলরক্ষক। ৮৪ মিনিটে ফার্নান্দেজের আরও একটি নিশ্চিত গোল গোললাইন থেকে দারুণ দক্ষতায় রক্ষা করেন নেমাতভ।
তবে ৮৭ মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের নিখুঁত কোণাকুণি শট ঠেকানোর কোনো সাধ্য ছিল না গোলরক্ষকের। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-০। ম্যাচের যোগ করা সময়ে ত্রিনকাওয়ের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং একদম শেষ মিনিটে রোনালদো হ্যাটট্রিকের শেষ সুযোগটি হাতছাড়া করলে ৫-০ ব্যবধানের বড় জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম গোলটি করার সাথে সাথেই অনন্য সব কীর্তি নিজের করে নেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো:
৬ বিশ্বকাপে গোল: বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড গড়লেন তিনি, যেখানে ৫টি বিশ্বকাপে গোল করে পেছনে পড়ে রইলেন লিওনেল মেসি।
দ্বিতীয় বয়োবৃদ্ধ গোলদাতা: ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় বয়োবৃদ্ধ গোলদাতার রেকর্ড গড়লেন সিআর সেভেন। তার ওপরে আছেন কেবল ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলা (৪২ বছর ৩৯ দিন)।
ইউসেবিওকে ছাড়িয়ে শীর্ষে: ৩৯ মিনিটের দ্বিতীয় গোলটির মাধ্যমে বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সর্বোচ্চ ১০ গোলের মালিক হলেন রোনালদো। এর আগে প্রথম গোলটি করে তিনি কিংবদন্তি ইউসেবিওর (৯ গোল) পাশে বসেছিলেন।
সব মিলিয়ে হ্যাটট্রিক না পাওয়ার ছোট্ট আফসোস থাকলেও, এটি ছিল সমালোচকদের মুখে কুলুপ এঁটে রোনালদোর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের রাত।