
ইরানের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার করে দেশটির পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে একটি স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হস্তক্ষেপের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের নড়বড়ে সরকার ব্যবস্থা উৎখাতের সম্ভাব্য একটি পরিকল্পনায় রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধাকে ইরানে প্রবেশ করানো।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে মার্কিন বিমান সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ পরিকল্পনাটি তৈরি করে এবং বিষয়টি সিআইএর সঙ্গে আলোচনাও করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে কুর্দি যোদ্ধাদের ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে প্রবেশ করিয়ে সেখানে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। একই সঙ্গে ইরানের ভেতরে থাকা কুর্দিদের অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কুর্দিদের ছয়টি সংগঠনের যোদ্ধাদের এই অভিযানে যুক্ত করার কথা ছিল। ইসরায়েল পশ্চিম ইরানে যে সামরিক হামলা চালিয়েছিল, সেগুলোকে কুর্দি বাহিনীর সম্ভাব্য অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করার প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হয়েছিল।
একপর্যায়ে ১৮ মার্চ কুর্দি সশস্ত্র জোট ইরানে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাদের প্রয়োজন ছিল কেবল ট্রাম্পের অনুমোদন।
তবে এর আগেই পরিকল্পনাটি নিয়ে তুরস্কের আপত্তি সামনে আসে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। দেশটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে-র বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের যুদ্ধে কুর্দি মিলিশিয়াদের ব্যবহার করা হলে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে তুরস্কের পূর্ব সীমান্তে অবস্থান নিতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল এরদোয়ানের।
ইসরায়েলি ও উপসাগরীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরদোয়ান ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন যে তিনি এই অঞ্চলের কোথাও কুর্দিদের স্বাধীনতার সুযোগ মেনে নেবেন না।
ওয়াশিংটনের ওপর পরিকল্পনাটি বাতিলের জন্য চাপও দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। একই সময়ে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশও সতর্ক করে দেয়, ইরানকে জাতিগতভাবে বিভক্ত করার চেষ্টা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিচুয়েশন রুমের বৈঠকের পর কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে কুর্দিদের দিয়ে ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযান পরিচালনার বিষয়টিকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করা হয়।
সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ যখন ট্রাম্পকে এ বিষয়ে অবহিত করেন, তখন নেতানিয়াহুর সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে ট্রাম্প ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প ওই পরিকল্পনার কিছু অংশ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ইরানের দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে স্থানীয় কর্মকর্তাদেরও উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার প্রস্তুতির সময় ইসরায়েল পশ্চিম ইরানে ধারাবাহিক হামলা চালায়। এসব হামলায় ইরানের সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, পুলিশ স্টেশন ও বাসিজ বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়।
এর ফলে ধারণা তৈরি হয়, ইসরায়েল সম্ভবত কুর্দি যোদ্ধাদের সম্ভাব্য অগ্রযাত্রার পথ প্রস্তুত করছে।
ইরানের কুর্দি সংগঠনগুলোর একটি জোটও নিজেদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সংগঠনটির নেতারা তখন দাবি করেছিলেন, তাদের বাহিনী যুদ্ধে অংশ নিলে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে পরবর্তী সময়ে কুর্দি সংগঠনগুলো শুধু সামরিক সহায়তার পরিবর্তে রাজনৈতিক নিশ্চয়তাও দাবি করতে শুরু করে। এতে পরিকল্পনাটি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হওয়ার পর এর বিভিন্ন দিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে।
মার্চে ফক্স নিউজ একটি অভিযান শুরুর খবর প্রকাশ করলে হোয়াইট হাউসের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ইরান যুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের অস্ত্র দিচ্ছে না।
অন্যদিকে, এ সময় তুরস্ক ওয়াশিংটনের ওপর পরিকল্পনাটি বাতিলের জন্য চাপ দিচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হওয়ার পর ইসরায়েলেও অসন্তোষ তৈরি হয়। মোসাদের পরিচালক রোমান গোফম্যান ইরানের সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাটির দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইরানের সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প কখনো হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, কখনো ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন বন্ধ করার কথা বলেছেন। আবার কখনো ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, ইরানের সরকার পরিবর্তন তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল না। একই সঙ্গে তিনি ইরানে ইতোমধ্যে দুবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং নতুন সরকার আগের সরকারের তুলনায় বেশি ‘যৌক্তিক’—এমন দাবিও করেছেন।
জুলাইয়ের ২৮ তারিখ ওভাল অফিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও ইরানের সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে দ্য টেলিগ্রাফকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নেতানিয়াহু তখনও নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে সরকার পরিবর্তন সম্ভব বলে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ট্রাম্পকে রাজি করাতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এরপর সামরিক হামলার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পথ বেছে নেন ট্রাম্প।
ফলে কুর্দি বাহিনীকে ব্যবহার করে ইরানের সরকার পরিবর্তনের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকৌশল আরও জটিল হয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।