
শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা মামলার নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ ১৬.৬৮ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে সম্মত হয়েছে মেটা প্ল্যাটফর্মস। আদালতের নথি অনুযায়ী, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে শিশুদের জন্য আসক্তিকর করে তোলা, প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা এবং শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য অনিয়মিতভাবে সংগ্রহের অভিযোগ ছিল মামলাগুলোতে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই এই সমঝোতা হয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শিশুদের ক্ষতির অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচার এ পর্যায়ে নিষ্পত্তির পথে গেল।
সমঝোতার অংশ হিসেবে কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ব্যবহারের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করবে মেটা। এর মধ্যে দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা এবং রাতে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বাধা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
মেটো সমঝোতায় সম্মত হলেও কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করেনি। কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তিকে স্বীকৃত মানসিক রোগ হিসেবে গণ্য করা হয় না—এমন যুক্তিও আগের শুনানিতে তুলে ধরেছিল মেটা।
মামলাগুলোর একটি অংশে ২৯টি অঙ্গরাজ্য অভিযোগ করে, শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করে মেটা এমন ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে, যাদের বয়স সম্পর্কে কোম্পানিটি জানত। ওই তথ্য মেশিন লার্নিং ও জেনারেটিভ এআই মডেল প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
ফেডারেল বিচারপ্রক্রিয়ায় ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সির অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব অঙ্গরাজ্যের দাবি ছিল, মেটা তাদের ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে।
বিচার শুরুর আগে মেটা জানিয়েছিল, চার অঙ্গরাজ্য সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার জরিমানা দাবি করছে। তবে অঙ্গরাজ্যগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সম্ভাব্য জরিমানার পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
অঙ্গরাজ্যগুলো আর্থিক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মেটার প্ল্যাটফর্মে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের দাবিও জানিয়েছিল।
শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটের সম্পর্ক নিয়ে মেটার পাশাপাশি স্ন্যাপ, ইউটিউবের মালিক অ্যালফাবেট এবং টিকটকের মালিক বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মামলা রয়েছে।
এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, কোম্পানিগুলো এমন কিছু ফিচার ও নকশা তৈরি করেছে, যা শিশু ও কিশোরদের প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে এবং আসক্ত করে তুলতে পারে। অঙ্গরাজ্য সরকার, স্কুল জেলা ও ব্যক্তিগত বাদীরাও এসব মামলার অংশ।
এর আগে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় মেটা দুই ধাপের বিচারেই হেরে যায়। মার্চে একটি জুরি কোম্পানিটিকে ভোক্তাদের প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে বিভ্রান্ত করার দায়ে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
এরপর ৬ আগস্ট এক বিচারক মেটার কর্মকাণ্ডকে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করে কোম্পানিটিকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
মার্চে মেটা ও গুগলের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির করা মামলার বিচারেও বাদীর পক্ষে রায় আসে। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি দুই কোম্পানিকে বাদীর বিষণ্নতা ও উদ্বেগের জন্য দায়ী করে সম্মিলিতভাবে ৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কোম্পানিগুলো ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া কেনটাকির একটি স্কুল জেলার করা মামলাতেও মেটাসহ চারটি কোম্পানি সমঝোতায় যায়। প্রকাশ্য নথি অনুযায়ী, ব্রেথিট কাউন্টি স্কুল ডিস্ট্রিক্টকে চার কোম্পানির কাছ থেকে সম্মিলিতভাবে ২৭ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনি পদক্ষেপের ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির চাপ ক্রমেই বাড়ছে। মেটার এই সমঝোতা সেই বৃহত্তর আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।