
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, কালের দাবি
প্রকৃতির দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। হিমালয়ের পাহাড়ে যে বিপর্যয় শুরু হয়, তার অভিঘাত নদীর স্রোত, পরিবেশ ও অর্থনীতির মাধ্যমে বহু দূরের জনপদেও পৌঁছাতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস, হিমবাহধস এবং ভূমিকম্পের ঘটনা তাই শুধু নেপালের দুর্যোগ নয় ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রশ্ন একটাই এ ধরনের আকস্মিক ও বহুমাত্রিক দুর্যোগের জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূত্রপাত। হিমবাহের বিশাল অংশ ধসে পড়ে আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত তৈরি হয়। এর সঙ্গে ভূমিধস ও ভূকম্পনের ঘটনাও সামনে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।
এই ঘটনা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নেপালের পাহাড়ি নদীগুলো বৃহত্তর গঙ্গা অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত। উজানের কোনো বড় ধরনের জলবিপর্যয় সরাসরি একই মাত্রায় বাংলাদেশে পৌঁছাবে এমন নয়। কিন্তু হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতার পরিবর্তন যে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার পানি নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। আমাদের নদী ব্যবস্থার একটি বড় অংশ দেশের সীমানার বাইরে উৎপন্ন। ফলে উজানে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস, হিমবাহধস কিংবা আকস্মিক জলপ্রবাহের মতো ঘটনা আমাদের নদী ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু নেপালের পানি বাংলাদেশে কতটা আসবে এমন সরল সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগ যদি ভবিষ্যতে বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশ তার আগাম সংকেত কত দ্রুত পাবে?
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কয়েক ঘণ্টা আগে একটি সতর্কবার্তা পৌঁছানো গেলে বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব; কয়েক ঘণ্টা দেরি হলে একই সতর্কতা অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগের ক্ষেত্রে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য যথেষ্ট নয়। নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বৃষ্টিপাত, নদীর পানি, হিমবাহের পরিবর্তন, ভূমিধস এবং আকস্মিক জলপ্রবাহের তথ্য দ্রুত বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
নেপালের ঘটনা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে একটি দুর্যোগ আরেকটি দুর্যোগকে ডেকে আনতে পারে। ভূমিকম্প বা পাহাড়ধস হিমবাহকে অস্থিতিশীল করতে পারে, হিমবাহধস নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে, আবার সেই বাধা ভেঙে তৈরি হতে পারে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা।
বাংলাদেশেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। দেশের বড় নদী, বাঁধ, জলাধার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। দুর্যোগ প্রস্তুতি তাই শুধু বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রিক হলে চলবে না; ভূমিকম্প, বন্যা, ভূমিধস, বাঁধ বিপর্যয় এবং জলবায়ুজনিত চরম আবহাওয়া সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
নেপালের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির কোনো পাসপোর্ট নেই। নদী জানে না কোথায় একটি দেশের সীমান্ত শেষ, কোথায় আরেকটি দেশের সীমান্ত শুরু। তাই নদী ব্যবস্থাপনাও শুধু জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।
দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোকে অববাহিকাভিত্তিকভাবে দেখতে হবে। নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়াতে হবে। হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট তথ্য, সিসমিক সেন্সর, নদীর পানির রিয়েল-টাইম তথ্য এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আঞ্চলিক কাঠামোর আওতায় আনা দরকার। নেপাল নিজেও সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর আরও উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা ভাবছে। বাংলাদেশেরও এখন নিজেদের সক্ষমতা নতুন করে মূল্যায়ন করার সময়।
দুর্যোগের পরে উদ্ধার ও ত্রাণ গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্যোগের আগেই মানুষকে নিরাপদ করা।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তালিকা, আশ্রয়কেন্দ্র, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, উদ্ধার সরঞ্জাম, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল, নিম্নাঞ্চল ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা জনপদকে প্রস্তুতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হিমালয়ের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক বন্যা এসবের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানি ও দুর্যোগ নিরাপত্তা গভীরভাবে যুক্ত।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই বাংলাদেশের জন্য ভয় পাওয়ার কারণ নয়; প্রস্তুত হওয়ার কারণ।
আমাদের এখনই প্রশ্ন করতে হবে উজানে এমন কোনো বিপর্যয় ঘটলে আমরা কত দ্রুত জানতে পারব? কত দ্রুত সতর্ক করতে পারব? কত দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নিতে পারব? আর আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো কতটা নিরাপদ?
কারণ দুর্যোগ কখনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই নির্ভর করে আমরা আগে থেকে কতটা প্রস্তুত ছিলাম তার ওপর।
নেপালের বিপর্যয় তাই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা উজানের দুর্যোগ যখন ভাটির জন্যও ঝুঁকির সংকেত, তখন বাংলাদেশকে প্রস্তুত হতে হবে আজই, দুর্যোগের পরে নয়।