
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা যৌথভাবে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে বসে থাকার সময় শেষ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, মানুষের দুর্ভোগ এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ধ্বংসের বিষয়টি দেখে নিষ্ক্রিয় থাকার পথ থেকে সরে এসেছে যুক্তরাজ্য।
লন্ডন দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে নিয়ে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। তবে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ সেই সমাধানের সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে বলে দেশটির সরকার মনে করে।
নিষেধাজ্ঞার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন করে বসতি নির্মাণের ইসরায়েলি পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে জেরুজালেমের কাছের ‘ই-ওয়ান’ এলাকায় বসতি প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ফিলিস্তিনিরা যে ভূখণ্ডে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে, সেই এলাকার সঙ্গে ই-ওয়ান প্রকল্পের সংযোগ রয়েছে। মিলিব্যান্ডের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে আরও প্রায় ১ হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে অধিকৃত ভূখণ্ডে আরও ১ হাজার ২০০টি বসতি নির্মাণের পরিকল্পনাও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।
জাতিসংঘসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে।
তবে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের বড় বাণিজ্যিক সম্পর্কের তুলনায় এই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কারণ, ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে উৎপাদিত পণ্য এবং পশ্চিম তীরের বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আলাদা করে শনাক্ত করার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে যাওয়া পণ্যের বড় অংশই কৃষিপণ্য ও ওয়াইন—যা দুই দেশের মোট বাণিজ্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ।
যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তের পর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার জানিয়েছেন, পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এই কনস্যুলেট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
এ ছাড়া ইসরায়েল আরও কয়েকটি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিরিয়াত গাতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক গাজা সহায়তা কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের বহিষ্কার, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাহিনীকে প্রশিক্ষণে ব্রিটিশ কার্যক্রম বন্ধ এবং ১২ জন ব্রিটিশ নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নাগরিকের ইসরায়েলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা জেরেমি করবিন, জারা সুলতানা, নাজ শাহ, ডায়ান অ্যাবট, হান্না স্পেন্সার, কার্লা ডেনিয়ার, সিয়ান বেরি, এলি চাউনস, জন ম্যাকডোনেল, রিচার্ড বার্গন ও অ্যাড্রিয়ান রামসে। তালিকায় লন্ডনভিত্তিক ‘রিভারওয়ে টু দ্য সি’ সংগঠনের পরিচালক ফাহাদ আনসারিও রয়েছেন।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ এর আগে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মতপার্থক্য আরও প্রকাশ্য হয়েছে। যুক্তরাজ্য পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারত্বকে অবৈধ বলে মনে করে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানকে একতরফা বলে সমালোচনা করছে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁর দেশের আসন্ন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছেন।
ফলে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের প্রশ্নটি এখন শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ইসরায়েল ও পশ্চিমা মিত্রদের কূটনৈতিক সম্পর্কেও পড়ছে।