
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার দুই বছর পূর্ণ হলেও এখনো মামলাটির বিচার শুরু হয়নি। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে চোর সন্দেহে তাঁকে হলের ভেতরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় পিবিআইয়ের পুনঃতদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তবে তাঁদের ১৭ জন এখনো গ্রেপ্তার হননি। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই আসামি কারাগারে এবং নয়জন জামিনে রয়েছেন। বাকি ১৭ জন পলাতক। মামলার বাদী ও তোফাজ্জলের পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বিচার শুরুর দাবি জানিয়েছেন।
তোফাজ্জলকে হত্যা করা হয় ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই রাতে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁকে ধরে অতিথিকক্ষে নিয়ে যান। তাঁর বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ তুলে মারধর করা হয়।
পরে তোফাজ্জল মানসিকভাবে অসুস্থ—এটি বুঝতে পেরে তাঁকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়। কিন্তু এরপর আবার তাঁকে হলের দক্ষিণ ভবনের অতিথিকক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।
ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়। ভিডিওতে তোফাজ্জলকে মারধরের আগে ভাত খাওয়ানোর দৃশ্যও দেখা যায়।
ঘটনার পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথম তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
তবে ওই অভিযোগপত্রে নারাজি আবেদন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরপর আদালত পিবিআইকে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। পুনঃতদন্ত শেষে পিবিআই আরও সাতজনকে যুক্ত করে মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা দেওয়া হয়েছে এবং পলাতকদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার।
মামলার প্রসিকিউশন জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। এরপর মামলাটি বিচার শুরুর জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হতে পারে এবং সেখানে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে।
তোফাজ্জলের মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া বিচার বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। মামলার বাদীও প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
তোফাজ্জল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বাবা-মা ও বড় ভাই মারা যাওয়ার পর তাঁর মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন।
দুই বছর পরও মামলার বিচার শুরু না হওয়ায় এখন মূল অপেক্ষা পলাতক ১৭ আসামিকে গ্রেপ্তার এবং আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার।