
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সাফল্য তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ইরান ও কিউবাসহ কয়েকটি দেশের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ এই ভাষণে সামরিক শক্তি, যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্রিনল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেন এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতির কথা জানান। তিনি বলেন, তাঁর প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে এবং পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।
ভাষণে কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, তাঁর প্রশাসন কিউবার পরিস্থিতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করছে এবং দেশটির বর্তমান ব্যবস্থার পতন ঘটবে।
ট্রাম্পের বক্তব্য চলার সময় কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পরে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে বলেন, কিউবা একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র।
জাতিসংঘের মঞ্চে ইরান নিয়েও কঠোর বক্তব্য দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সংঘাতের অবসানে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে আলোচনার সম্ভাবনার পাশাপাশি সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকিও ছিল। যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আলোচনার সম্ভাবনার কথাও বলেন।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভাষণে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নতুন একটি চুক্তিরও প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই চুক্তির আওতায় আর্কটিক অঞ্চলের গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি হবে।
ট্রাম্প বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমেরিকা ও ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়বে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ন্যাটোর প্রতিরক্ষা জোটকেও আরও শক্তিশালী করবে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। অঞ্চলটির পররাষ্ট্রনীতি মূলত ডেনমার্ক পরিচালনা করে।
জাতিসংঘের ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি ‘Artificial Intelligence’ বা এআইকে ‘Super Intelligence’ হিসেবে অভিহিত করার প্রস্তাব দেন।
ট্রাম্পের মতে, ‘Artificial’ শব্দটি প্রযুক্তিটিকে নকল বা কৃত্রিম কিছু হিসেবে উপস্থাপন করে। তাঁর ভাষণে এআইকে অসাধারণ সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং একই সঙ্গে এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
এর আগে ট্রাম্প এআই উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে শীর্ষ অবস্থানে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এআই নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিধিনিষেধের বিষয়েও তাঁর অবস্থান বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্পের পুরো ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ ও সামরিক সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। তিনি তাঁর পরিচিত ‘America First’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দেন।
একই সঙ্গে নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সক্রিয় নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন ট্রাম্প। তবে তাঁর ভাষণের বিভিন্ন অংশে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি ও কঠোর পররাষ্ট্রনীতির বার্তাও ছিল।
ফলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের এবারের ভাষণে একদিকে শান্তি ও কূটনীতির কথা, অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুঁশিয়ারি—দুই ধরনের বার্তাই উঠে এসেছে।