
আগামী ২০২৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ৪০টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করবে কাতারএনার্জি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি তাদের চুক্তিবদ্ধ সরবরাহের ৬৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সংস্থা কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি ২৪টি কার্গোর মধ্যে ১৮টি সরবরাহের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে কাতার থেকে আগামী বছর মোট ৪৪টি এলএনজি কার্গো পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। তবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে গ্যাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় পুরো বছরের আমদানি সূচি এখনই চূড়ান্ত করছে না সরকার।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৮ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আপাতত ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সরবরাহ সূচি তৈরির নির্দেশ দিয়েছে পেট্রোবাংলাকে।
বাংলাদেশ শুরুতে ২০২৭ সালে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে অন্তত ১০৩টি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চুক্তিবদ্ধ মোট ১২৮টি কার্গোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এলএনজি উৎপাদন ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'ফোর্স ম্যাজিউর' ঘোষণা করায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে নীতিনির্ধারকদের ধারণা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা হলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহকারীরাও চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকে আপাতত আমদানি সূচি সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিংয়ের (ওকিউটি) কাছ থেকে ২০২৭ সালে ৩২টি কার্গো পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করেনি।
ওকিউটি চুক্তিবদ্ধ পরিমাণের অর্ধেক, অর্থাৎ ১৬টি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ব্রেন্টনির্ভর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির পরিবর্তে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচক অনুসারে দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম হবে জেকেএম সূচকের চেয়ে ০.০৪ ডলার কম।
তবে পেট্রোবাংলা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিদ্যমান চুক্তির শর্ত মেনে চলার কথা জানিয়েছে। গত মার্চে সরবরাহ সংকট শুরুর পর থেকে 'ফোর্স ম্যাজিউর' দেখিয়ে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রেখেছে ওকিউটি।
২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে ১১৭টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের লক্ষ্যে গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে ১৩ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এ চুক্তির আওতায় ২০২৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি ছয়টি কার্গো সরবরাহ করবে।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জেকেএম সূচকভিত্তিক দামে মোট ১৪টি কার্গো দেবে গানভর। এর মধ্যে ২০২৬ সালে পাঁচটি, ২০২৭ সালে ছয়টি এবং ২০২৮ সালে তিনটি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। এসব কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউর দাম হবে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৮৭৫ ডলার যোগ করে।
বাকি ১০৩টি কার্গো ২০২৮ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। সেগুলোর দাম নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব সূচকের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫.২০ ডলার যোগ করে।
এ ছাড়া ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে ২০২৭ সালে ১২টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ১৮টি কার্গো সরবরাহের লক্ষ্যে করা স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অংশ হিসেবে এসব গ্যাস আসবে। এ ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম হবে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৬ ডলার যোগ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক্সেলেরেট গ্যাস ২০২৭ সালের জন্য নির্ধারিত ১৪টি কার্গোর মধ্যে ৯টির সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে গিয়ে সরকারকে বাড়তি আর্থিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
প্রতিটি এলএনজি কার্গো রিগ্যাসিফিকেশনের পর প্রায় ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়। তাই নির্ধারিত কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করা দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা বিবেচনায় রেখে মার্চের পরের আমদানি পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রাখতে চায় পেট্রোবাংলা। এ কারণে আপাতত মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ সূচি প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।