আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, সীমান্ত অতিক্রম করে আসা আফগানিস্তানের চারটি ড্রোন বেলুচিস্তান আকাশসীমায় প্রবেশের পর ভূপাতিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের ভেতরে আইএসআইএল (আইএস) সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান পরিচালনা করেছে। এই ঘটনার পর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বুধবার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চারটি ড্রোন শনাক্ত হওয়ার পর আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলো ধ্বংস করা হয়। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নরম অবস্থানের কারণেই সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, কাবুলে তালেবান প্রশাসনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের পিশিন জেলা এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার কিছু এলাকায় আইএস সংশ্লিষ্ট ঘাঁটিতে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযানে শুধুমাত্র সশস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং কোনো বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে উভয় পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার পটভূমি
দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত নতুন নয়। গত ২৭ জুন পাকিস্তানের করাচিতে একটি আধাসামরিক বাহিনীর স্থাপনায় হামলায় তিনজন নিহত হন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি অংশ এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং আটক সন্দেহভাজনদের মধ্যে একজন আফগান নাগরিকও রয়েছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ২৯ জুন পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাক্তিয়া, পাক্তিকা এবং কুনার প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদের দাবি অনুযায়ী, এতে অন্তত ২৫ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তবে তালেবান প্রশাসন জানিয়েছে, ওই হামলায় ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সামরিক উত্তেজনা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের সম্ভাব্য কৌশল কী?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান আপাতত "নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া" নীতি অনুসরণ করতে পারে। অর্থাৎ, সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা হলেও আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে পারে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমনে সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হচ্ছে?
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চীনের মধ্যস্থতায় উরুমকিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই আলোচনার পর সীমান্ত পরিস্থিতিতে সাময়িক উন্নতি দেখা গেলেও কয়েক মাসের মধ্যেই আবার উত্তেজনা ফিরে আসে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয়ই নিজেদের নিরাপত্তা সমস্যার জন্য একে অপরকে দায়ী করছে। পাকিস্তান মনে করে, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির উপস্থিতি তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। অন্যদিকে, আফগান পক্ষের অভিযোগ, পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বলতার দায় কাবুলের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের সমাধানে কার্যকর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালের দাবি ডেস্ক