বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারও বড় দলগুলোর প্রতি বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) ও রেফারিদের তথাকথিত 'বিশেষ আনুকূল্য' এবং আফ্রিকান দেশগুলোর প্রতি পদ্ধতিগত বৈষম্যের অভিযোগ জোরালো হয়ে উঠেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেনেগালের নাটকীয় ও বিতর্কিত বিদায় ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—ফুটবলের আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি বড় দলগুলোর জন্য আলাদা?
বেলজিয়াম ম্যাচে রেফারিং বিতর্ক: 'ইঞ্জিনিয়ার্ড' পেনাল্টি?
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে (১২৫ মিনিটে) ল্যামিন কামারার চ্যালেঞ্জে ইউরি টিলেমানস পড়ে গেলে হন্ডুরাসের রেফারি সাইদ মার্তিনেজ পেনাল্টির বাঁশি বাজান। অথচ ভিডিও অ্যানালিসিস প্ল্যাটফর্মগুলোর (যেমন: Archivo VAR) স্পষ্ট বক্তব্য—বেলজিয়ামের অধিনায়ক টিলেমানস নিজেই পা বাড়িয়ে কন্টাক্ট বা সংঘর্ষটি তৈরি করেছিলেন, যা কোনোভাবেই পেনাল্টি পাওয়ার যোগ্য ছিল না。
গ্যারি নেভিলের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবল বিশ্লেষকরাও সরাসরি বলেছেন, "আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না এটি পেনাল্টি ছিল।" সাবেক আইরিশ অধিনায়ক রয় কিন মন্তব্য করেছেন, রেফারি নিজেই স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। প্রশ্ন উঠছে—যদি একই পরিস্থিতি বেলজিয়ামের ডি-বক্সে সেনেগালের কোনো খেলোয়াড়ের সাথে ঘটতো, রেফারি কি এত সহজে বড় দলটির বিরুদ্ধে পেনাল্টি দেওয়ার সাহস দেখাতেন? ২০২৬ বিশ্বকাপে শুধু সেনেগালই নয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার স্পষ্ট পেনাল্টি বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও এই পক্ষপাতমূলক রেফারিংয়ের ধারণাকে আরও উসকে দিয়েছে।
মাঠের বাইরে বর্ণবাদ ও লাঞ্ছনা
ফুটবলে বর্ণবাদের বিষাক্ত থাবা মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে এবার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনের ৬ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে কোনো কারণ ছাড়াই ভিসা দেয়নি দেশটির প্রশাসন। এমনকি সেনেগাল জাতীয় দল যখন বিমানবন্দরে পৌঁছায়, তখন বিশ্বমানের এই অ্যাথলেটদের সাথে অপরাধীদের মতো আচরণ ও অত্যন্ত অপমানজনকভাবে অতিরিক্ত সিকিউরিটি চেক করা হয়, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
একই টুর্নামেন্টে আফ্রিকার বর্ষসেরা রেফারি ওমর আরতেনকে বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মাঠের বাইরে এই বর্ণবাদী আচরণ এবং মাঠের ভেতরে ইউরোপীয় দলগুলোর পক্ষে রেফারিদের সফট কর্নার—দুটি বিষয় একই সুতোয় গাঁথা বলে মনে করছেন ফুটবল সমর্থকরা।
বড় দলগুলোর প্রতি ফিফার অদৃশ্য নরম সুর
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিফা এবং রেফারিদের ওপর ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার বড় দলগুলোর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ থাকে। ঘানার ফরোয়ার্ড অ্যান্টোইন সেমেনিও ম্যাচ শেষে আক্ষেপ করে বলেন, ইউরোপীয় দলগুলো যেভাবে অফিশিয়ালদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, আফ্রিকান দলগুলো তা করে না। এই সুযোগেই রেফারিরা বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো বড় দলগুলোর পক্ষে দিয়ে দেন, কারণ তাতে টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক আকর্ষণ বজায় থাকে।
ফুটবলকে বিশ্বজনীন ও বৈষম্যহীন করার স্লোগান ফিফা বারবার দিলেও, সেনেগালের এই কান্নায় ভেজা বিদায় প্রমাণ করে—ফুটবলের ভেতরের গভীর বৈষম্য ও বর্ণবাদের ছায়া দূর করতে ফিফা এখনও পুরোপুরি ব্যর্থ।
কালের দাবি ডেস্ক