বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ ও পাম্প থেকেও প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানীয় জল সংগ্রহ যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি সেচনির্ভর কৃষিও ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। শুষ্ক মৌসুমে নদী, খাল, বিল ও পুকুরের পানি দ্রুত কমে যায়। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা বিদ্যমান। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি প্রবাহের অভিযোগ বহুদিনের। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক জলাধারগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৬০ থেকে ১৮০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে কৃষিতে সেচের সংকটের পাশাপাশি আর্সেনিকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী এবং জলাভূমিনির্ভর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
একসময় বাংলাদেশের নদী ও খালগুলো পলিবাহী পানির মাধ্যমে কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধি করত। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, বিস্তৃত জলাভূমি এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, নদী ও খাল দখল এবং অযত্নের কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
বোরো মৌসুমে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে গভীর নলকূপ ও সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে কৃষি আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
একসময় দেশের বহু অঞ্চলে মৎস্যজীবীরা ছিল অন্যতম বৃহৎ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। কিন্তু জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং পানির সংকটের কারণে তাদের অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ইতিহাসে খাল খনন কর্মসূচি একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ এবং সেচব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যাপক খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেচের সুযোগ বৃদ্ধি পায়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কিছুটা কমে এবং কৃষি উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সে সময়ে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়, যা কৃষিজমিতে সেচ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খালের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, পলি পরিবহন এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির সুফলও কৃষিতে প্রতিফলিত হয়েছিল।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পূর্বাঞ্চলে প্রায় প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা দেখা দিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে মানবিক বিপর্যয়। নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। নদী ও খালকে বাদ দিয়ে দেশের অর্থনীতি, কৃষি কিংবা পরিবেশ কল্পনা করা যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে অসংখ্য নদী ও খাল আজ অস্তিত্ব সংকটে। তাই খাল ও নদীর সীমানা সুরক্ষা, দখলমুক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় পুনঃখনন এখন সময়ের দাবি।
খাল পুনঃখনন ও সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব—
কৃষকের জন্য সেচের পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা ‘ওয়াটার ব্যাংক’ গড়ে উঠবে।
অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশন সহজ হবে।
মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।
মাটির উর্বরতা ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ভূগর্ভস্থ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় কেবল গভীর নলকূপের সংখ্যা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজন নদী, খাল ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে খাল সংস্কার ও পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে স্থান পাওয়া উচিত।
লেখক: ডনেল ড্যানিয়েল কস্তা

কালের দাবি ডেস্ক