২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে এটাই সর্বনিম্ন পাসের হার। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এসএমএসের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়। পরে সচিবালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
এবারের ফলাফলে পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। সে হিসাবে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
এর আগে ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর আর কোনো বছর পাসের হার এত নিচে নামেনি।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, নির্বাচিত সরকারের আয়োজিত প্রথম এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীরা খাতায় যেভাবে উত্তর দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই ফল নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে পারে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ফলাফলে এভাবে পাসের হার কমে আসা কাম্য নয়। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের শিখন পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও সামগ্রিক পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এসব ঘাটতি চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। ফলাফলে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীরা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করতে পারবে।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্মূল্যায়নের উদাহরণ তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ওই পরীক্ষায় প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়, ৫ হাজার শিক্ষার্থী অকৃতকার্য থেকে উত্তীর্ণ হয় এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে ৩ হাজার ৭৯ জন।
এই পরিবর্তনের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষক বা খাতা মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, এবারের ফল নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন হলেও ফলাফলে ত্রুটি রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুনর্নিরীক্ষার পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
এবারের ফলাফলে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এসব বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৫০ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৮৬ জন।
সামগ্রিকভাবে ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ছাত্রীদের মধ্যে পাস করেছে ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্রী।
গত বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সে বছর ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এবার পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি আগের ফলাফলের অবনতির আলোচনায় উঠে এসেছিল। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায়ও পাসের হার কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সরকার শিখন ঘাটতি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইট, নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারছে।
ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতায় আগের সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বোর্ড চেয়ারম্যানদের ফলের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার রীতি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই আনুষ্ঠানিকতা বাদ দেওয়া হয়। বর্তমান সরকারও একই ধারায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করেছে।
এবারের ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় শিক্ষার মান, শিখন ঘাটতি এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পুনর্নিরীক্ষার পর ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

কালের দাবি ডেস্ক