ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে বাংলাদেশের মহাবিপন্ন এশিয়ান হাতির অস্তিত্ব। মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাত কমিয়ে সহাবস্থান নিশ্চিত করা, হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে করণীয় নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান ‘The Coexistence Dialogue: People, Elephant & Shared Landscapes’।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাংবাদিকতার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয় প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোস্তফা ইউসুফকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণ, বনভূমি দখল, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. সোহেল রানা।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী ও প্রকৃতি সংরক্ষণে আগ্রহী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক, যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজাসহ ছাত্রদলের অন্যান্য নেতাকর্মীরাও অংশ নেন। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পরিবেশ সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য মোস্তফা ইউসুফকে সম্মাননা প্রদান।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক সাংবাদিকতায় কাজ করছেন। এর আগে তিনি নিউ এজ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও দ্য ডেইলি স্টারে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সুন্দরবন ছাড়াও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চিরহরিৎ ও মিশ্র চিরহরিৎ বন নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী কাজ বিশেষভাবে আলোচিত। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বনভূমির ক্ষতি, আইন উপেক্ষা করে বনভূমি অধিগ্রহণ ও ইজারা দেওয়া এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়গুলো তিনি ধারাবাহিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
কক্সবাজারে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত বনভূমি ব্যবহারের বিষয়েও তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন। একই সঙ্গে এশিয়ান হাতির আবাসস্থল দখল, ভুল বনায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে হাতির চলাচলের পথ ও আবাসস্থল কীভাবে সংকুচিত হচ্ছে, সে বিষয়েও তাঁর একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি, হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির সামাজিক প্রভাব এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনসহ পরিবেশ ও মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা বিষয়ও তাঁর সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত কমিয়ে সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাতি সংরক্ষণের জন্য শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষা করলেই হবে না; তাদের চলাচলের করিডর ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলও সংরক্ষণ করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে মানুষ ও হাতির সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কালের দাবি ডেস্ক