মো. ইমরান হোসেন
শিক্ষার্থী ও তরুণ কলামিস্ট
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এরপরই পর্দা নামবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। বাংলাদেশ সময় ২০ জুলাই রাত ১টায় ফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন। চার বছর পর পর ফিরে আসা এই মহারণ শুধু দুটি দেশের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের লড়াই নয়; হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশেও এটি যেন এক মহাউৎসবে পরিণত হয়েছে।
রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান—সবখানেই এখন বিশ্বকাপের আমেজ। কোথাও বিশাল পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন, কোথাও উড়ছে প্রিয় দলের বিশাল পতাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে চলছে ভবিষ্যদ্বাণী, বিশ্লেষণ আর তর্ক-বিতর্ক। একদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা লিওনেল মেসির জাদুকরী ফুটবল, হুলিয়ান আলভারেজের গতি কিংবা এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দৃঢ়তায় ভরসা রাখছেন। অন্যদিকে স্পেন সমর্থকদের আস্থা পেদ্রি, গাভি, নিকো উইলিয়ামস ও লামিন ইয়ামালের নান্দনিক পাসিং ফুটবলে।
এই উচ্ছ্বাস নিঃসন্দেহে আনন্দের। খেলাধুলা মানুষকে একত্র করে, ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং সাময়িকভাবে হলেও জীবনের একঘেয়েমি দূর করে। কিন্তু এই উৎসবের মাঝেই একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—এই বিপুল আবেগের শেষ পরিণতি কী? আর এর কতটা আমাদের নিজেদের জন্য ইতিবাচক?
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম পৃথিবীতেই বিরল এক উদাহরণ। অথচ বৈশ্বিক ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও অনেক পিছিয়ে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের নিচের সারিতে থাকা একটি দেশের মানুষ যখন অন্য দেশের জয়-পরাজয়কে নিজেদের আবেগের অংশ করে নেয়, তখন সেটি যেমন ভালোবাসার প্রকাশ, তেমনি আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ।
আবেগ অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু সেই আবেগ যদি অন্ধ সমর্থনে রূপ নেয়, তখন তা আর ক্রীড়াসুলভ থাকে না। আমরা প্রায়ই দেখি, ফুটবল নিয়ে তর্ক ব্যক্তিগত বিদ্বেষে গড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন ভাষা, বন্ধুত্বে ফাটল, এমনকি কোথাও কোথাও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। অথচ একটি খেলার জয় বা পরাজয় কখনোই মানুষের সম্পর্ক, সম্প্রীতি কিংবা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চেয়ে বড় হতে পারে না।
বাস্তবতা হলো, আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেন—যেই দলই বিশ্বকাপ জিতুক, তাতে বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক বা জাতীয় বাস্তবতা বদলে যাবে না। পরিবর্তন ঘটবে না আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও। তাই সমর্থন থাকুক, কিন্তু সেটি যেন সুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বরং আমাদের ভাবা উচিত অন্য একটি বিষয়। ভিনদেশি ফুটবলের জন্য আমরা যে সময়, অর্থ ও আবেগ ব্যয় করি, তার সামান্য অংশও যদি দেশের ফুটবলের পেছনে ব্যয় করতাম, তাহলে হয়তো আজ দৃশ্যপট কিছুটা হলেও ভিন্ন হতে পারত। স্থানীয় ক্লাব ফুটবলে দর্শক বাড়ত, তরুণ ফুটবলাররা অনুপ্রেরণা পেতেন, অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিও আরও জোরালো হতো। হয়তো একদিন লাল-সবুজের জার্সিও বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিত—যে স্বপ্ন আজও আমাদের কাছে অনেক দূরের।
আজকের ফাইনালের নব্বই মিনিট শেষে একটি দল ইতিহাস গড়বে, আরেকটি দল স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে মাঠ ছাড়বে। কিন্তু সেই উৎসব শেষ হওয়ার পরও আমাদের সমাজ, আমাদের মানুষ এবং আমাদের জাতীয় পরিচয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
তাই ফুটবলকে ফুটবল হিসেবেই উপভোগ করি। সুস্থ তর্ক হোক, বিশ্লেষণ হোক, প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসাও থাকুক। তবে সেই ভালোবাসা যেন বিভেদ বা বিদ্বেষের কারণ না হয়।
মাঠে জার্সির রং আকাশি-সাদা, লাল কিংবা অন্য যে কোনো রঙের হতে পারে। কিন্তু মাঠের বাইরে আমাদের পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশি। তাই ভিনদেশের ফুটবলকে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজেদের ফুটবল, নিজেদের খেলোয়াড় এবং সর্বোপরি লাল-সবুজের পতাকার প্রতিও সমান দায়বদ্ধ থাকি।
ফুটবলের জয় হোক, জয় হোক সম্প্রীতির।

কালের দাবি ডেস্ক