ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেল,নতুন সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 30, 2026 ইং
এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেল,নতুন সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর ছবির ক্যাপশন: এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। প্রতীকী ছবি।
ad728

এলডিসি উত্তরণে আরও ৩ বছর সময় পেল বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষে উরুগুয়ের উত্থাপিত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এ সিদ্ধান্ত নেয়। বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।

সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, আন্তর্জাতিক সহায়তায় নির্বিঘ্ন উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রতিবছর উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালের প্রস্তুতির সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।


পোশাক খাতে স্বস্তির আশা

এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে বাংলাদেশের।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময়ের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সুখবর উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাড়তি সময় অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এবং যেসব দেশের সঙ্গে প্রয়োজন, সেসব দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার কাজে ব্যবহার করতে হবে।

অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুধু উত্তরণের সময়সীমা বাড়ালেই অর্থনীতি প্রতিযোগিতাসক্ষম হয়ে উঠবে না। এ জন্য বাণিজ্য, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।


যে কারণে সময় বাড়ানোর আবেদন

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (ইউএন-সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এ আবেদন জানানো হয়। পরে ইউএন-সিডিপি আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করে। গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) সাধারণ পরিষদকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ পাঠায়।

সময় বাড়ানোর ফলে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের নীতিমালা সাপেক্ষে বাংলাদেশ অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময়েও এলডিসি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বাণিজ্য সুবিধা বজায় রাখার সুযোগ পেতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, সময় বাড়ানো মানেই উত্তরণের চ্যালেঞ্জগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যাওয়া নয়। নতুন সময়সীমার আগেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে।


বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পটভূমি

১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন, তৈরি পোশাক রপ্তানি, রেমিট্যান্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি দেশটিকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করে।

২০১৮ ও ২০২১ সালের পরপর দুটি পর্যালোচনায় মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক—এ তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে বাংলাদেশ।

এরপর ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউএন-সিডিপি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সুপারিশ করে। একই বছরের ৮ জুন ইকোসক সেই সুপারিশ অনুমোদন করে। ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদও উত্তরণের বিষয়ে সম্মতি জানায়।

কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশকে স্বাভাবিক তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী চূড়ান্ত উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। নতুন সিদ্ধান্তে তা আরও তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর করা হয়েছে।


উত্তরণের পর যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ

এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার পরিবর্তন হলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়তে পারে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের মতো বাজারে পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে এ পরিবর্তনের মাত্রা ও কার্যকর হওয়ার সময় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য অংশীদারদের নিজস্ব নীতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার ওপর।

বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলনের (আঙ্কটাড) ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, বাণিজ্য সুবিধা হারালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে এটি সম্ভাব্য প্রভাবের একটি প্রাক্কলন, নিশ্চিত ফলাফল নয়।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ বাড়তি সময় পাবে। পাশাপাশি এখনো কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে না পারায় এ ধরনের চুক্তি সম্পাদনের সুযোগও বাড়বে।

তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে পাওয়া অতিরিক্ত সময় কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে।


তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পে ঝুঁকি

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধার পরিবর্তন হলে এ খাত বিশেষ চাপে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের কার্যকর দাম বেড়ে গেলে ক্রয়াদেশ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের মানোন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ওষুধশিল্পও উত্তরণের পর নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিধিমালার আওতায় কিছু বিশেষ ছাড় পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর প্রযোজ্য নিয়মের পরিবর্তন প্যাটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণা ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এলডিসি-নির্দিষ্ট কিছু সহায়তা ও সহজ শর্তের ঋণ ব্যবস্থায় উত্তরণের পর পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ সব অনুদান বা সহজ শর্তের ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।

এ অবস্থায় অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামাজিক উন্নয়নে অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা জরুরি হবে।


২০২৯ সালের আগে যেসব সংস্কার জরুরি

আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিকল্প সুবিধা পাওয়ার পথ খোঁজার পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারে গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো ও রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্দর ও শুল্ক বিভাগের সেবার উন্নয়নও প্রয়োজন।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, পাটজাত পণ্য ও ইলেকট্রনিকস খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, উত্তরণের পর শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্য সুবিধার সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে আগেভাগেই আলোচনা শুরু করা উচিত। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, করের আওতা বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যবসার খরচ কমানো এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য স্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রকাশ করা উচিত।

সব মিলিয়ে এলডিসি উত্তরণে বাড়তি তিন বছর বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সময়ের সুফল নির্ভর করবে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ও বেসরকারি খাত কতটা কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে তার ওপর।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সাভারে মাদ্রাসাছাত্রকে ছয় মাস ধরে ধর্ষণের অভিযোগ, ২ শিক্ষকসহ

সাভারে মাদ্রাসাছাত্রকে ছয় মাস ধরে ধর্ষণের অভিযোগ, ২ শিক্ষকসহ