ঢাকা | বঙ্গাব্দ

‘অভ্যুত্থানের অপার সম্ভাবনা ও অন্তর্গত দুর্বলতা নিয়েই আমরা হাঁটছি।’—সাইফুল হকের বিশেষ সাক্ষাৎকার। (১ম পর্ব)

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 16, 2026 ইং
‘অভ্যুত্থানের অপার সম্ভাবনা ও অন্তর্গত দুর্বলতা নিয়েই আমরা হাঁটছি।’—সাইফুল হকের বিশেষ সাক্ষাৎকার। (১ম পর্ব) ছবির ক্যাপশন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর কালের দাবির সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।
ad728

দুই বছর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজপথে নেমেছিল ছাত্র-তরুণ, শ্রমজীবী মানুষসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সেই গণজাগরণ ভেঙে দিয়েছিল ক্ষমতার অপরাজেয়তার বহুদিনের মিথ। কিন্তু দুই বছর পর এসে প্রশ্ন উঠেছে—অভ্যুত্থানের সেই বিপুল সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ পেয়েছে? রাষ্ট্র ও রাজনীতির কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন এসেছে? আর যে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তার কতটুকুই বা পূরণ হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধু একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তার মূল্যায়নে, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান একদিকে যেমন বাংলাদেশের জনগণের সাহস, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের নতুন শক্তিকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে এর ভেতরেই ছিল গভীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা। বিপ্লবী আদর্শ, নেতৃত্ব ও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির অভাবের কারণে অভ্যুত্থানের অন্তর্গত দুর্বলতাগুলো আজও বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। তাঁর ভাষায়, ‘অভ্যুত্থানের অপার সম্ভাবনা ও অন্তর্গত দুর্বলতা নিয়েই আমরা হাঁটছি।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র ও অর্জন, বিপ্লবী পরিবর্তনের সম্ভাবনা, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, রাষ্ট্র সংস্কারের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন, নতুন প্রজন্মের উত্থান ও তাদের বিতর্কিত হয়ে ওঠা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, ধর্মভিত্তিক ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান, পরাশক্তির ভূমিকা এবং নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ—সমসাময়িক রাজনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

দীর্ঘ এই আলাপচারিতায় বাংলাদেশের অতীতের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস নিয়ে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আদর্শিক অবস্থান থেকে মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন সাইফুল হক। সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে সাইফুল হকের এই বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের দাবির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দিপংকর চন্দ্র কর।

প্রশ্ন:

আপনি ৬৯, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের রাজপথে ছিলেন,ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে, ২০২৪-এর অভ্যুত্থানেও ছিলেন। কিন্তু এতগুলো গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক বা গুণগত রূপান্তর কেন ঘটল না? ভিন্নভাবে বললে, আমাদের গণঅভ্যুত্থানগুলোকে কেন বিপ্লবে পর্যবসিত করা গেল না?

সাইফুল হক:

'৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তো আমরা  স্বাধীনতা যুদ্ধের একটা প্রেক্ষাপট, একটা জমিন তৈরি করেছি। সেটা একটা ঐতিহাসিক অর্জন ছিল।

আর ৯০-এর যে গণঅভ্যুত্থান, এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী যে অভ্যুত্থান, এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা একটা সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে বিদায় দিয়েছি। পরবর্তীতে আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিবর্তনের যে রাজনীতি, সেই রাজনীতিতে, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় বাস্তবে ফিরে এসেছি।

আমরা ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, গণজাগরণ, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটা সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে বিদায় দিয়েছি। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে নির্বাচন এবং সাংবিধানিক শাসনে আবার ফিরে এসেছি। পরবর্তীতে একটা সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় বাংলাদেশ আবার প্রত্যাবর্তন করেছে।

আর এবারকার ২৪-এর যে গণজাগরণ, গণঅভ্যুত্থান, এর মধ্য দিয়েও আমরা একটা ফ্যাসিবাদী শাসনকে উচ্ছেদ করেছি।  মানুষের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচন  এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকার পরিবর্তনের যে পথ, সেটাকে আমরা এবার সুগম করেছি।

এগুলো বিশেষ সময়ে বিশেষ ঐতিহাসিক অর্জন—কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর কোনোটাতেই, এসব আন্দোলন-অভ্যুত্থানে, বিপ্লবী বামপন্থীরা নেতৃত্বদায়ী ভূমিকায় ছিলেন না। তারা সাথে ছিলেন, সহযোগী ভূমিকা পালন করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছেন। কিন্তু একটা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটা বিপ্লবী নেতৃত্ব বলতে যা আমরা বুঝি—যাদের নেতৃত্বে আদর্শিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে বিপ্লব হয় —এরকম কোনো বিপ্লবী নেতৃত্ব এসব অভ্যুত্থানের সামনে ছিল না।

২০২৪-এর আগে যেসব গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, প্রধানত একটা বুর্জোয়া অথবা পাতি-বুর্জোয়া নেতৃত্বেই মূলগতভাবে এসব অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। যেখানে বামপন্থীরা ছিল, প্রগতিশীল কমিউনিস্টরা ছিল, কিন্তু বাস্তবে একটা বিপ্লবী পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে বিপ্লবী শক্তি এখানে ওরকম একটা ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

আর ২৪-এর ক্ষেত্রে, যেটা বললাম, এখানে বিপ্লবী বামপন্থীদের একটা অংশ এই অভ্যুত্থানে যুক্ত ছিলেন, তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু সমগ্র আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করা, নেতৃত্ব প্রদান করা অথবা আন্দোলনের প্রধান নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠা—সেই ভূমিকাটা  আমরা, বিপ্লবী বামপন্থীরা পালন করতে পারিনি।

 এই আন্দোলনের অনেক অর্জন থাকলেও  এই আন্দোলন আবার এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে; ধর্মান্ধ, কূপমণ্ডূক, এক ধরনের জঙ্গিবাদী-মৌলবাদী ভাবনা-চিন্তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এটা এখানকার বাম-প্রগতিশীল বিপ্লবী ধারার ব্যর্থতার একটা পরোক্ষ প্রমাণ বলা যাবে। কারণ তাদের  কার্যকরি উপস্থিতি  থাকলে এরকম একটা দৃশ্য হয়তো দেখতে হতো না।

তারপরও এই অভ্যুত্থানের  বেশ কিছু অর্জন আছে। আকাংখ্যা ও চরিত্রের দিক থেকে এর মধ্যে একটা  বিপ্লবী প্রবণতা ছিল। ৯০-এর অভ্যুত্থান যেমন কোনো বিপ্লবী অভ্যুত্থান ছিল না, ২৪-এর অভ্যুত্থানও তেমনি কোনো বিপ্লবী অভ্যুত্থান নয়। এটা গণজাগরণ। গণজাগরণে সমাজের নানা অংশের মানুষ, নানা চিন্তা, মতাদর্শ, রাজনীতি নিয়ে যুক্ত ছিলেন; একটা  অংশ পশ্চাৎপদ কূপমণ্ডূকতা নিয়েও  যুক্ত ছিলেন।

 এর মধ্যে বড় কোনো পরিবর্তনের  আশা করাটা হয়তো আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে ছিল, কিন্তু এটাকে বাস্তবায়ন করবার মতো কোনো বৈষয়িক প্রস্তুতি এদেশের বিপ্লবী বামপন্থীদের বাস্তবে ছিল না।এই সীমাবদ্ধতা নিয়েই এখন অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি চলছে।

প্রশ্ন:

 জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? দুই বছর পর দাঁড়িয়ে কোন অর্জনটিকে আপনি সবচেয়ে ঐতিহাসিক বলে মনে করেন?

সাইফুল হক:

 জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন যদি বলি—সে অর্জন হচ্ছে, আমরা একটা কর্তৃত্ববাদী, চরম ফ্যাসিবাদী শাসনকে বিদায় দিয়েছি। এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় অর্জন।

আর এর মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে একটা দলীয় কর্তৃত্ব, ক্ষমতাকে একটা জমিদারি হিসেবে বিবেচনা করেছেন; অনেকটা ব্যক্তিগত-পারিবারিক মালিকানা হিসেবে যারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করেছেন, অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে  তারা অজেয় থাকবেন এই ধারণা, এই মিথকে ভেঙে দেওয়া গেছে।

 এর মধ্য দিয়ে মানুষের ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছে। একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। এখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা আমি মনে করি সবচেয়ে বড় অর্জনের জায়গা।

ভবিষ্যতের জন্য  এই অভ্যুত্থান অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। আজকে দুই বছর পরে অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে যে হতাশা, যে দুঃখবোধ অথবা  অনেকেরই এক ধরনের  মনখারাপ—তার বড় কারণ হচ্ছে, অভ্যুত্থানে যেহেতু কোনো বিপ্লবী আদর্শ সামনে ছিল না, বিপ্লবী পার্টি ছিল না, বিপ্লবী নেতৃত্ব ছিল না, বিপ্লবী কোনো এজেন্ডাও অভ্যুত্থানের সামনে ছিল না,  এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।

ফলে অন্তর্গতভাবে অভ্যুত্থানের যে দুর্বলতা, বাস্তবে সেটা নিয়েই আমরা এখন হাঁটছি। এই অভ্যুত্থান আসলে পরবর্তীতে একটা বিপ্লবী অভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তাকে, তার জরুরত বা আবশ্যকতাকে অনেক জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রশ্ন:

এই অভ্যুত্থান সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চেতনায় কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে?

সাইফুল হক:

সামাজিক চেতনায় বা সামাজিক মনস্তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন যেটা তা হচ্ছে, মানুষের মধ্যে সাহসটা,ঝুঁকি নেবার ক্ষমতা  অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আত্মবিশ্বাস, সাহস—এটা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

আর মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, মানুষের শক্তির কাছে আসলে, কোনো দমনমূলক রাষ্ট্র বা কোনো শক্তি শেষ বিচারে  তার সামনে দাঁড়াতে পারেনা, তারা পরাজিত হতে বাধ্য হয়।  আর মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক দল-নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন  অন্ধ আনুগত্যের বিষয়টাও  বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। একটা বিরাট নতুন প্রজন্ম জেগে উঠেছে—যারা প্রশ্ন করতে শিখেছে, যারা যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, প্রশ্ন তোলা এবং যারা নিজেদের মধ্য দিয়ে একটা বৈষম্যহীন মানবিক সমাজের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারে—এই ঝুঁকি নেবার যে মানসিকতা, অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেটা আমরা লক্ষ্য করেছি।

আর মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বড় অর্জনের জায়গাটা হচ্ছে, এখানে পুরোনো অনেক মিথ—অনেক দলের, অনেক ব্যক্তিত্বের, অনেক চিন্তার, অনেক আইডিয়ার—এগুলো আসলে ভেঙে গেছে।  অনেকগুলো মিথ গুঁড়িয়ে দেয়া  গেছে। এই ধরনের নতুন মিথ আর ভবিষ্যতে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এখন মানুষ সবকিছুকে জিজ্ঞাসা করা, প্রশ্ন করা, জানতে চাওয়া, বুঝতে চাওয়া—এই জায়গায় এসেছে। এখন প্রত্যেকেই  একটা কঠিন নজরদারির মধ্যে, এক ধরনের  সার্ভাইল্যান্সের মধ্যে প্রায় প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিটি দল, প্রতিটি মানুষ—এটাই হচ্ছে অভ্যুত্থানের একটা বড় অর্জন।

এখন প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মানুষ  আগের তুলনায় অনেক বেশি মরিয়া, অনেক বেশি আপসহীন। এরকম একটা সম্ভাবনা এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন: 

লেনিনের সরকার যেমন রুশ বিপ্লবের সরকার, খামেনির সরকার যেমন ইরান বিপ্লবের সরকার; অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কি আপনি জুলাইয়ের সরকার বলে মনে করেন? নাকি ফরাসি বিপ্লবের মতো বিপ্লব ছিনতাই হয়েছিল জুলাইয়ের পরে? নাকি বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা অভিনব?

সাইফুল হক:

এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমত, আপনি যে বিপ্লবগুলোর কথা উল্লেখ করলেন, এটা সেই বিপ্লবগুলোর মতো নয়। যেটা আমি আগেও উল্লেখ করেছি— আমাদেরএই গণঅভ্যুত্থান  ছিল দৃশ্যত একটা বৈষম্যবিরোধী  গণতান্ত্রিক চরিত্রের আন্দোলন; এটা বাস্তবে কোনো পরিষ্কার বিপ্লবী লক্ষ্য নিয়ে, বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ কোনো বিপ্লবী পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এই আন্দোলন-অভ্যুত্থানটা সংঘটিত হয়নি। সে ধরনের আদর্শ সামনে ছিল না, রাজনীতিও ছিল না, সংগঠন বা নেতৃত্বও এখানে ছিল না।

এটা এক ধরনের গণচরিত্রের আন্দোলন । এখানে বুর্জোয়ার উদারনৈতিক অংশ থেকে শুরু করে একেবারে সমাজের প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন।  সাধারণ  স্বার্থটা ছিল—প্রত্যেকে ভোটাধিকার চান, প্রত্যেকে একটা অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে চান, নির্বাচিত সরকার দেখতে চান এবং প্রত্যেকে একটা অন্যায়, একটা অবিচারের প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন।

আর  অভ্যুত্থানের পর প্রফেসর ইউনুসের যে সরকার, বাস্তবে ছাত্র-তরুণরাই মূলত তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ বা কিছু ব্যক্তির  রাজনৈতিক পছন্দের জায়গা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন এবং তিনিই অল্প কিছু লোক নিয়ে তার উপদেষ্টা মণ্ডলী গঠন করেছেন। এর মধ্যে বড কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে এমনটা মনে হয়না।

যারা এসেছেন উপদেষ্টামণ্ডলীতে, তারা অধিকাংশই তাদের মনে বা দেহে অভ্যুত্থানের সঙ্গে অর্গানিক্যালি, জীবন্তভাবে যুক্ত ছিলেন না। এদের অনেকের কছে রাতারাতি এই ক্ষমতা এক ধরনের লটারি পাওয়ার মতো অবস্থা ছিল।

অভ্যুত্থানের যে স্পিরিট—একটা পরিবর্তন, একটা দুর্বৃত্ত শাসনের বিরুদ্ধে, একটা লুটতন্ত্রের বিরুদ্ধে, একটা ভোটচুরির বিরুদ্ধে—এই পুরো অভ্যুত্থানের মূলগত এই দাবিগুলোর ব্যাপারেও অন্তর্বর্তী সরকারের বড় কোন কমিটমেণ্ট ছিলন। তার উপদেষ্টারাও এটাকে দেহে ধারণ করতে পারেনি। ফলে তাদের সঙ্গে আমজনতার এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা, এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার ছিল পেটি-বুর্জোয়া চরিত্রেরই একটা সরকার। যারা কিছু সংস্কারকে সামনে রেখে কাজ  করার চেষ্টা করেছে । অনেকে  এই ব্যবস্থার মধ্যেই কিছুটা জবাবদিহিতা, কিছুটা স্বচ্ছতা এবং কিছুটা দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে একটা পরিবর্তন দেখতে চেয়েছে। গেল ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এটুকু  অর্জন করার সুযোগ তৈরী  হয়েছে। 

এই গণঅভ্যুত্থান আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও  উৎপাদন পদ্ধতির কোনো পরিবর্তন ঘটানো দুরের কথা, এক্ষেত্রে তারা সামান আঁচড় কাটতে পারেনি ; মৌলিক কোন  পরিবর্তনের প্রশ্নতো সুদুর পরাহত। সমস্ত কিছুই বাস্তবে আগের মতো  বহাল তবিয়তে আছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের উপরে কিছু ব্যক্তির পরিবর্তন হয়েছে  মাত্র।এইসব পরিবর্তন হল একটা উদারনৈতিক  রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার  কিছু সম্ভাবনা  তৈরি হয়েছে। এইটুকু সর্বোচ্চ বলা যেতে পারে।

প্রশ্ন:

জুলাইয়ের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আপনি বলেছেন, অধিকাংশ সংস্কার আলোচনা ছিল অনেকটা ‘কসমেটিক’। আপনার মতে রাষ্ট্রের কোন কোন মৌলিক কাঠামো না বদলালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়?

সাইফুল হক:

যে বাস্তবতায় আমি ২০২৬-এ এখন যখন কথা বলছি, তখন নির্বাচনের পরে বিএনপির মতো একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। তারা একটা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চান বলে ঘোষণা দিচ্ছেন।

তারা নিজেরাই বলছেন—তারা কোনো বিপ্লবী দল নন, তারা কোনো বিপ্লবী সরকার গঠন করেনি, তাদের কোনো বিপ্লবী এজেন্ডাও নেই।

 এটা খুব পরিষ্কার যে এ ধরনের একটা সরকারের পক্ষে বিদ্যমান দুর্বৃত্ত যে রাষ্ট্র, গোটা দুর্বৃত্ত অর্থনীতি, দুর্বৃত্ত যে রাজনীতি, গোটা সমাজের যে দুর্বৃত্তায়ন—এর বিরুদ্ধে বাস্তবে তেমন কোনো সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ শ্রেণীগতভাবে  নেওয়া সম্ভব না। এটা নিয়ে হা-হুতাশ করার কিছু নেই। এটা শ্রেণী হিসেবে বিএনপির সীমাবদ্ধতা, এটা দল হিসেবে এ ধরনের দলের বাস্তব  সীমাবদ্ধতা।

এটা নিয়ে এখন তারা যেটা করতে পারেন—একটা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা। যখন আমি সংস্কার বলি, তার অর্থটা কী? সংস্কারের অর্থটা হচ্ছে বিদ্যমান গোটা ব্যবস্থার কিছু চুনকাম করা। সংস্কার বলতে বড়জোর  এর উপরিকাঠামোর কিছু পরিবর্তন হয়তো বুঝানো হচ্ছে।

কিন্তু গোটা অর্থনীতি যেখানে দুর্বৃত্তায়িত, গোটা রাজনীতি যেখানে দুর্বৃত্তায়িত, সেখানে এ ধরনের একটা ব্যবস্থার কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা  অমূলকই হবে। তাহলে হতাশাটা বাড়বে।

বরঞ্চ এখন তারা একটা উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় কি না, যেখানে সরকার বা আইনপ্রণেতারা কিছুটা স্বচ্ছতার পরিচয় দেবেন, জবাবদিহিতার পরিচয় দেবেন, তারা কিছুটা দায়বদ্ধতার পরিচয় দেবেন এবং এই সিস্টেমের মধ্যে কিছুটা নিয়মতান্ত্রিকতা—একদিকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিবর্তন, আরেকদিকে এই সিস্টেমের মধ্যেই দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের যে মহামারী চলছে, এটার কিছুটা যদি লাগাম টেনে ধরা যায় এবং  একটা প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক ধারায় বাংলাদেশের রাজনীতিকে যদি পর্যায়ক্রমে বিকশিত করা যায়, আমি মনে করি এটুকু করতে পারলেই বিএনপির জন্য অনেক বিরাট অর্জন হবে।

এটুকু করতে পারলেই পরবর্তীতে এই গণতান্ত্রিক পরিসরের মধ্য দিয়ে সত্যি সত্যি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যদি কোনো বিপ্লবী শক্তি গড়ে উঠতে পারে, তারা এই গণতান্ত্রিক পরিসরের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে যদি কোনো বিপ্লবী পার্টি, বিপ্লবী এজেন্ডা, বিপ্লবী কর্মসূচি নিয়ে এগোতে পারেন,  একটা বিপ্লবী পরিবর্তন করতে পারেন—সেটা  ভবিষ্যতে একটা  গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।বস্তুত এই গুণগত পরিবর্তন ব্যতিরেকে বাংলাদেশ ও তার জনগণের মুক্তির কোন নিদান নেই।

এই মুহূর্তে এখনকার সরকারের পক্ষে আসলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন শ্রেণীগতভাবে সম্ভব না—এই বাস্তব বিবেচনাটা থাকা দরকার।

প্রশ্ন

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি কোনো কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হয়েছে? রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কি কোনো মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, নাকি শেষ পর্যন্ত এটি একটি সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?


সাইফুল হক 

বাস্তবে এই জুলাই অভ্যুত্থান—এখানকার প্রচলিত রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছে, এরকম কোনো লক্ষণ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।

এখনো তাদের সেই পুরোনো চিন্তা, পুরোনো ধারা, পুরোনো অবস্থান, দল, কর্তৃত্ব, দখলদারিত্ব—এই ধারার মধ্যে পরিস্থিতি ঘুরপাক খাচ্ছে।

 আমার নিজেরও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং গত দুই বছরের যে অভিজ্ঞতা, এই পরিবর্তনটা উপরিকাঠামোর যেটা বললাম, কিছু কসমেটিক পরিবর্তন আনলেও রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সেক্ষেত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি 

 স্বচ্ছতার প্রশ্ন বলি, মানুষের কাছে জবাবদিহিতার প্রশ্ন বলি—এদিক থেকেও বড় কোনো পরিবর্তন এনেছে, এরকম কোনো লক্ষণ আমি এখনো পর্যন্ত দেখছি না।

হ্যাঁ,  রাজনৈতিক  ভারসাম্যের বড়  একটা পরিবর্তন হয়েছে।জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এতদিনের  রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটেছে । সেই পরিবর্তনটা হলো  এখানে একটা দক্ষিণপন্থার, একটা ধর্মীয় মতাদর্শের আড়ালে একটা দক্ষিণপন্থা, এক ধরনের জঙ্গিবাদী চিন্তাধারার  উত্থান ঘটেছে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, কিছুটা মননজগতেও।

 প্রফেসর ইউনূস তাঁর দেড় বছরের শাসনে  এটাকে বহুমাত্রিক মদদ জুগিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে  এদেরকে বাস্তবে একেবারে রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার করে নেয়া হয়েছিল। 

গত দুই বছরে এরা রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক মদদে  বিশাল অঙ্কের অর্থ-বিত্তেরও মালিক হয়েছে।

আর অর্থের তো নিজস্ব একটা শক্তি আছে।  গত নির্বাচনে শত শত কোটি টাকার যে ছড়াছড়ি, তার মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে এরা কী পরিমাণ টাকার মালিক হয়েছে!_

২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের  রাজনৈতিক  কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে, তার রাজনৈতিক উপস্থিতি না থাকায়  যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে—এটা প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক বা বামপন্থী ধারার রাজনীতি এই শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি।

একটা চরম দক্ষিণপন্থী, উগ্রবাদী, অসহিষ্ণু শক্তি তাদের রাজনীতি-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এই শুণ্যতা  পূরণ করার  চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। 

বাস্তবে এটা এক ধরনের কৃত্রিমভাবেই শূন্যতাটা পূরণ করবার চেষ্টা। কারণ এখনো পর্যন্ত বলতে পারি, আওয়ামী লীগ যদি দল হিসেবে বাদও দিই, এই যে কয়েক কোটি মানুষ—যারা আওয়ামী লীগ বা এই রাজনীতির প্যারাডাইমের মধ্যে যে রাজনীতিটা ছিল, সেই জায়গার ক্ষেত্রে একটা শূন্যতার জায়গা তৈরি হয়েছে।; যেটা সুস্পষ্ট ও  সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রাজনীতি নিয়ে বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি পূরণ করতে পারত। সে জায়গাটা এখনো পর্যন্ত হয়নি।

 রাজনীতির এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।  আমরা আগামী আরও ছয় মাস, এক বছরে অনেকগুলো ঘটনা হয়তো ঘটতে দেখব বলে আমার আশঙ্কা।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো পর্যন্ত আমার কিছুটা পলিমাটির মতোই—বাংলাদেশ বদ্বীপ যেমন পলিমাটির মতোই প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে, রাজনীতিরও একটা ভাঙা-গড়া আমি দেখছি আগামী ছয় মাস, এক বছর, দুই বছরের মধ্যে। অনেক নতুন প্রাণ, নতুন তৎপরতা, নতুন উদ্যোগ, নতুন সংকট, নতুন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার একটা ক্ষেত্র ইতিমধ্যে তৈরি হচ্ছে বলে আমার ধারণা।

 বিদ্যমান রাজনীতির যেটুকু ভারসাম্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক ভারসাম্য নয়। এই ভারসাম্যের পরিবর্তনের সম্ভাবনাটাও বাড়ছে। একটা নতুন রাজনৈতিক  সমীকরণের, একটা নতুন ধরনের রাজনীতির সমীকরণ, নতুন ধরনের ভারসাম্য, নতুন ধরনের পুনর্বিন্যাস হওয়ার জায়গাটা বাড়ছে।

এই নতুন পুনর্বিন্যাস ঠিক কোন চেহারা নেবে সেটা পরিপূর্ণভাবে এখুনি বলা না গেলেও এটা বলা যেতে পারে, এখন আমরা যেটুকু ভারসাম্য দেখছি, এটা সম্ভবত টেকসই কোনো ভারসাম্য নয়। এ ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত।

দেশকে কিভাবে  প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক  রাজনৈতিক ধারায়   এগিয়ে নেওয়া যাবে এবং তার জন্য সামষ্টিকভাবে  কোন ধরনের রাজনৈতিক  ভারসাম্য আমাদের তৈরি করা দরকার এটা নির্ধারণ করা হবে মনোযোগের বড় একটা যায়গা। সেটার জন্য আমাদের  হয়তো আর একটু অপেক্ষা করতে হবে।


প্রশ্ন: 

জুলাই আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনার বা সম্মুখযোদ্ধাদের একটি অংশ কেন অল্প সময়ের মধ্যেই এত বেশি বিতর্কিত হয়ে পড়ল বলে আপনার মনে হয়?


সাইফুল হক

আমাদের জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-তরুণদের যে অংশটা, যারা কোটা আন্দোলন থেকে যুক্ত হতে হতে ২৪-এর অভ্যুত্থানেও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন,  তাদের অনেকেই ফ্রন্টলাইনে ছিলেন। ২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ করে  তাদের একাংশের  যে বিতর্কিত হয়ে যাওয়া- প্রধান কারণ মনে হয়েছে তাদের সরকারে যুক্ত হওয়া,  এই যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই আসলে মূলত তাদের বিতর্কিত হওয়াটা শুরু হলো।

সরকার ব্যবস্থার যে ক্ষমতা, আর ক্ষমতার সাথে দ্রুত অর্থবিত্ত গড়ে তোলার একটা সম্পর্ক থাকে। আর যেহেতু এই তরুণদের বিপুল অধিকাংশেরই নির্দিষ্ট  কোনো পলিটিক্যাল আইডিওলজি নাই, স্পষ্ট কোনো রাজনীতির জায়গাটা নাই; একটা ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে তাদের একটা ক্ষোভ আর আক্রোশ আছে,  হাসিনার অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সাথে তাদেরও একটা ক্ষোভ ছিল; আর  তাদের তো ইমিডিয়েট  ইস্যু ছিল চাকুরীর অন্যায় কোটা, চাকরি—এসব তাদের আশু বিষয় ছিল।

 এই তরুণদের প্রতিনিধিরা সরকারে যুক্ত হওয়ার পরে তারা গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই একধরনের হজম হয়ে গেছে এবং খুব দ্রুত ক্ষমতার সাথে তাদেরকে  লোভও গ্রাস করে ফেলেছে। আর এই লোভে পড়ে ক্ষমতা এবং অর্থ যখন একসাথে দাঁড়িয়ে যায়, তখন মানুষের স্বাভাবিক হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তখন সে বিচ্যুত হতে শুরু করে। নানা বিকৃতি, নানা ধরনের দম্ভ, অহমিকা—এগুলো বাড়তে থাকে। 

তাদের বিতর্কিত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের সরকারে যুক্ত হওয়া। এবং ইউনূস সরকার নিজেদের  নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য  এই তরুণদের ব্যবহার করেছেন। আর তরুণরাও তার বিনিময়ে ক্ষমতাকে একধরনের লাইসেন্স হিসেবে দেখেছে—ক্ষমতায় থেকে  যা খুশি তা-ই করা যায়;  অনেক ক্ষেত্রে তারা তা করেও দেখিয়েছে।এর মধ্য দিয়ে

তারা কেবল এই তরুণদের  ভবিষ্যৎতই নষ্ট করেনি, তারা গোটা একটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে  নষ্ট করে দিয়েছে।

ক্ষমতা  যদি হয় দ্রুত অর্থকড়ি করা, টাকা-পয়সা বানানো, গাড়ি-বাড়ি বানানো, ঠিকাদারি, তদবির, বাণিজ্য, প্রমোশন; তাহলে তো সেটা ভয়াবহ। এসব তো পুরোপুরি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার বিরুদ্ধে।

অও৯যে চেতনা ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে , যে চেতনার গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, যে চেতনা সুযোগের সমতার জন্য, যে চেতনা ছিল অধিকারের জন্য, যে চেতনা ছিল রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে রাজনীতি, ধর্মবিশ্বাসের জন্য কোনো আলাদা করবে না,  দেখা গেল একেবারে তার উল্টো দিকে তাদের যাত্রা শুরু হলো। এই পরিস্থিতি এখনও কমবেশি অব্যাহত আছে, এখনো তারা সেই বৃত্তের মধ্যেই আছে, এখান থেকে এখনো তারা বের হতে পারেনি।

যেহেতু  তাদেরকে  ক্ষমতার লোভ পেয়ে বসেছে, তারা রাজনীতিকে মনে করেছে একধরনের  টি-টোয়েন্টি  ক্রিকেট খেলার মতো বা ওয়ানডে খেলার মতো। ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’, ‘ভিনি, ভিডি, ভিসি’—এরকম একটা জায়গা মনে হয়েছে।  যেটার পরিণতি

এখন দেখা যাচ্ছে  তাদের অহেতুক  উত্তেজনা, অসহিষ্ণুতা, গালাগালি, চিৎকার প্রভৃতির মধ্য দিয়ে। এর উৎস আবার এক ধরনের হতাশা ও নৈরাশ্য।

রাজনীতি যে প্রতীকী অর্থে অনেকটা পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচের মতো, একটা দীর্ঘ যাত্রার মতো; এখানে আইডিওলজি আছে, পলিটিক্স আছে, কর্মসূচি আছে, ভিশন আছে, রাজপথের লড়াই আছে, একটা দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতার প্রশ্ন আছে। এভাবে  তারা রাজনীতিকে বিবেচনা করেনি বা তাদেরকে এরকম পরামর্শও দেয়া হয়নি, যেজন্য তাদের আজকের এই পরিণতি হয়েছে।

প্রশ্ন: কেউ কেউ দাবি করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই দাবি সম্পর্কে আপনার অবস্থান কী?


সাইফুল হক

আমি মনে করি যে আমাদের  ১৬ বছর ৩৬ দিনের লড়াইটা, এটা প্রধানত আমাদের জনগণের লড়াই। আমাদের জনগণ, শেষদিকে এসে ছাত্র, তরুণ, যুবক, সমাজের সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ—সবার  ফ্যাসিবাদী, কর্তৃত্ববাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বহু বছরের জমানো, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, আক্রোশের একটা বহিপ্রকাশ ছিল জুলাইয়ের এই গণজাগরণ, এই গণঅভ্যুত্থান এবং শেষঅব্দি এটা সত্যিকারের অর্থে গণচরিত্রে রূপ নেয়।

অভিভাবকরা, শিক্ষকরা, মায়েরা—যারা কখনো রাজপথে নামেননি, তারা যখন শামিল হয়ে গেলেন এবং সমাজের প্রায় সকল অংশ যখন এই আন্দোলনে যুক্ত হলো, তখন এটা গণচরিত্র রূপ নিয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র ধারণ করেছে।

চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, তারা যখন জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্বীকার করল, তখন আসলে অভ্যুত্থান একটা তুঙ্গ মুহূর্তে পৌঁছায়। ওটাকেও একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

 এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের কোনো ডিপ স্টেট অথবা তাদের ভূমিকার জন্যই এই অভ্যুত্থান—এটা একেবারেই একটা ভুল বক্তব্য, ফালতু কথা , এটা অন্যায় বক্তব্য।

হ্যাঁ, এখানে যখন দেশে কোনো গণজাগরণ তৈরি হয়, গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি  তৈরি হয়, রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, তখন ভিতর - বাইরের নানা শক্ত যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে, অনেক শক্তি কাজ করে। প্রত্যেকে চেষ্টা করে এই অভ্যুত্থানের সুযোগ নেওয়ার জন্য, পরবর্তী সংকটের সুযোগ নেওয়ার জন্য এবং পরবর্তীতে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হবে, সেখানেও তাদের অবস্থান তারা তৈরি করতে পারে কি না।এটা নতুন কিছু নয়।

সেদিক থেকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, পৃথিবীর নানা পরাশক্তি, সবারই কম-বেশি এ ব্যাপারে মনোযোগ ছিল। বিশেষ করে ঢাকায় বেশ কিছু দূতাবাস এখানে ভীষণভাবে সক্রিয়  ছিল।প্রত্যেকে যার যার মত করে এর উপর প্রভাব রাখতে  চেয়েছে। কিন্তু সেটা আন্দোলন-অভ্যুত্থানের নিয়ামক কোনো শক্তি নয়, এটা বলা মানেই হচ্ছে জনগণের শক্তিকে, আমাদের অভ্যুত্থানের ওপরে একধরনের কালিমা লেপন করা, অভ্যুত্থানকে একভাবে বিতর্কিত করা।

একটা কথা আছে না—‘ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দেওয়া’? যেকোনো বড় জাগরণ, গণসংগ্রাম, বড় অভ্যুত্থানে নানা শক্তি তখন এগিয়ে আসে, কে কীভাবে ভাগ নিতে পারে। সুতরাং সেটা দিয়ে গোটা অভ্যুত্থানের চরিত্র, তার মূল চালিকাশক্তি অথবা তার যে প্রাণসত্তা, সেটাকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা চলে না।

আমাদের অভ্যুত্থানের প্রাণসত্তা আমাদের মানুষ, ছাত্র-তরুণ, আমাদের যুবক—যারা জীবনদানের প্রতিযোগিতায় যুক্ত ছিল, শহীদ হয়েছে , সে মানুষদের কারণেই এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। নানা পরাশক্তি এটাকে তাদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে, করবে—এটাই স্বাভাবিক।







নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার