মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে হোয়াইট হাউসে বৈঠক হয়েছে। বৈঠক শেষে ট্রাম্প জানিয়েছেন, সির সঙ্গে তাঁর ‘দারুণ বৈঠক’ হয়েছে। আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি তাইওয়ান ও ইরান পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সি চিন পিং ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ান প্রশ্নে সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। চীনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট বলেও উল্লেখ করেন সি।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। বৈঠকের আগে তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রায় ১১ মাস আগে বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল। ওই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়েও ট্রাম্প ও সির মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে আলোচনায় চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন তাঁরা।
বৈঠকে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা কমানো এবং চীনের ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ও আলোচনা হয়েছে।
ট্রাম্প ও সির বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে দুই দেশই উদ্বিগ্ন। প্রযুক্তিটির অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
সি চিন পিং বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দুই দেশ হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। এআইকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার পাশাপাশি এর বিকাশ যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা দুই দেশকে নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্পও এআই বা তাঁর ভাষায় ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’-কে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিধিনিষেধের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকের শুরুতে সি চিন পিং বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। দুই দেশের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখা, পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া বাড়ানো এবং সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার পক্ষে মত দেন চীনের প্রেসিডেন্ট।
বৈঠকে ইরান পরিস্থিতিও উঠে আসে। সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সি চিন পিং চান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত জুনে করা সমঝোতা স্মারকের শর্তে ফিরে যাক।
ওই সমঝোতায় যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। ১৭ জুন সই হওয়া সমঝোতাটি কয়েক দিনের মধ্যেই ভেস্তে যায়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।
তবে জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প ও সির বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গ উঠে আসে।
সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিউয়ান গত বুধবার সন্ধ্যায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান। মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে তাঁদের স্বাগত জানান ট্রাম্প ও মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
১১ বছর পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওই সামরিক ঘাঁটিতে গিয়ে কোনো বিদেশি নেতাকে স্বাগত জানান। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
তিন দিনের সফরের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও অংশ নেন সি চিন পিং। বৈঠকটি চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

কালের দাবি ডেস্ক