ঢাকা | বঙ্গাব্দ

‘ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স’: মধ্যপ্রাচ্যে কেন নতুন ড্রোন জোট যুক্তরাষ্ট্রের?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 19, 2026 ইং
‘ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স’: মধ্যপ্রাচ্যে কেন নতুন ড্রোন জোট যুক্তরাষ্ট্রের? ছবির ক্যাপশন: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক ড্রোন কর্মসূচির অন্যতম ব্যবস্থা লুকাস ড্রোন।
ad728

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের মজুদ কমে আসার খবরের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন হামলার জন্য নতুন বহুজাতিক বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

‘ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স’ নামের এই বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ১৩ আগস্ট দেওয়া ঘোষণায় সেন্টকম জানিয়েছে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দেশগুলোর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বাহিনীতে আকাশে, পানির ওপর এবং পানির নিচে পরিচালিত একবার ব্যবহারযোগ্য মানববিহীন আক্রমণ ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক দেশের নাম প্রকাশ করা হয়নি।


কেন ড্রোননির্ভর বাহিনী?

মার্কিন সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দূরপাল্লার গোলাবারুদ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস বলছে, অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে।

একই সময়ে ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোর দুর্বলতাও সামনে এসেছে।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির প্রতিরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক স্টেসি পেটিজনের মতে, তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন দূরপাল্লার হামলাকে সহজ করে তুলেছে। এতে সেনা বা হামলার প্ল্যাটফর্মকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর কাছে না নিয়েও আক্রমণ চালানো সম্ভব হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কম খরচে বিপুল সংখ্যায় ব্যবহার করা যায় এমন ড্রোন আক্রমণকারীর পক্ষে সামরিক ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। বিপরীতে এগুলো ঠেকাতে ব্যবহৃত অনেক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং সংখ্যায় সীমিত।


স্করপিয়ন থেকে ফ্যালকন

আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মানববিহীন ব্যবস্থা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্সই সেন্টকমের প্রথম উদ্যোগ নয়।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাহরাইনে টাস্ক ফোর্স ৫৯ গঠন করে মার্কিন নৌবাহিনী। এর লক্ষ্য ছিল ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ খাল পর্যন্ত জলসীমা পর্যবেক্ষণ করা।

২০২৪ সালের শুরুতে ইউনিটটি ২৩টিরও বেশি ধরনের মানববিহীন ব্যবস্থা পরীক্ষা বা পরিচালনা করেছিল বলে মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য থেকে জানা যায়। পরে নজরদারির পাশাপাশি আক্রমণাত্মক ব্যবস্থার ব্যবহারও পরীক্ষা করা হয়।

২০২৩ সালের আগস্টে পেন্টাগন ‘রেপ্লিকেটর’ কর্মসূচি চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল তুলনামূলক কম খরচের ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দ্রুত বড় সংখ্যায় সশস্ত্র বাহিনীতে যুক্ত করা।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে ‘ড্রোন সুপ্রিমেসি’ কর্মসূচি নেওয়া হয়। একই সময়ে সেন্টকম ‘স্করপিয়ন স্ট্রাইক ফোর্স’ গঠন করে, যাকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বিশেষায়িত একক আঘাত হানতে সক্ষম ড্রোন বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।


৩৫ হাজার ডলারের লুকাস

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক ড্রোন কর্মসূচির অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা হলো ‘লুকাস’—লো-কস্ট আনম্যানড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম।

২০২৬ সালের মার্চে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি লুকাস ড্রোনের দাম প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। এর নকশা ইরানের শাহেদ ড্রোন দ্বারা প্রভাবিত বলে জানা যায়।

লুকাস ভূমি, যানবাহন কিংবা জাহাজের ডেক থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে এই ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছিল।

সেন্টকমের তথ্যমতে, পরবর্তী সময়ে তিনটি ‘করসেয়ার’ ড্রোন বন্দর আব্বাসের নৌঘাঁটির জাহাজ ও সাবমেরিন মেরামত স্থাপনায় হামলা চালায়। এটিকে আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহারের প্রথম মার্কিন যুদ্ধকালীন অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হয়।


বড় ঘাঁটির বদলে ছড়িয়ে থাকা ড্রোন

পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কয়েকটি বড় ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি এবং কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্লা এবং নির্ভুলতা বাড়ার সঙ্গে এসব বড় ও স্থায়ী ঘাঁটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

স্টেসি পেটিজনের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দেখিয়েছে যে স্থায়ী ঘাঁটি এবং বড় আকারের বিমান ও জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এর বিপরীতে ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ড্রোন, মানববিহীন নৌযান ও পানির নিচে পরিচালিত ছোট মানববিহীন ব্যবস্থা বিভিন্ন জায়গা থেকে মোতায়েন করা সম্ভব। এগুলো শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করাও তুলনামূলক কঠিন। ধ্বংস হলেও কম খরচের কারণে ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া সহজ।

ফ্যালকন স্ট্রাইক পরিকল্পনার সম্ভাব্য একটি সুবিধা তাই বড় ও স্থায়ী ঘাঁটি এবং নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর মার্কিন আক্রমণক্ষমতার নির্ভরতা কমানো।


বহুজাতিক বাহিনী গড়াই বড় চ্যালেঞ্জ

ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স বাস্তবে কার্যকর করতে ড্রোন সংগ্রহের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোকে একটি যৌথ আক্রমণাত্মক বাহিনীতে যুক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

স্টেসি পেটিজনের মতে, বহুজাতিক বাহিনী রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে বিভিন্ন দেশের বাহিনী ও সরঞ্জামকে একই কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করতে গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য বিনিময়, সমন্বয় ও সরঞ্জামের সামঞ্জস্য নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি প্রয়োজন রয়েছে—উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা মোতায়েন, সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ ও অভিযান পরিচালনার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর বিমানবন্দর, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহার করা।

তবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। ইরানও সতর্ক করে দিয়েছে, দেশটির বিরুদ্ধে হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণের পাশাপাশি ঘাঁটি বা অন্যান্য সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াকেও তারা একইভাবে বিবেচনা করবে।

ফলে কিছু দেশ প্রশিক্ষণ, সামুদ্রিক নজরদারি বা অবকাঠামো প্রতিরক্ষায় যুক্ত হলেও সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কেউ কেউ প্রকাশ্য সদস্যপদের পরিবর্তে গোপন গোয়েন্দা সহযোগিতাকেও অগ্রাধিকার দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স এখনো পূর্ণাঙ্গ বহুজাতিক বাহিনীতে পরিণত হয়নি। তবে এর পরিকল্পনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের একটি পরিবর্তন স্পষ্ট—ব্যয়বহুল ও সীমিত অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম খরচের, সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য এবং ছড়িয়ে থাকা মানববিহীন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো।

এই পরিকল্পনাকে কার্যকর সামরিক বাহিনীতে রূপ দিতে ড্রোনের উৎপাদন ও সরবরাহের পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
‘জীবনবান্ধব’ বাজেট উপহার দিতে চেয়েছি, জনগণের স্বস্তিই সরকারে

‘জীবনবান্ধব’ বাজেট উপহার দিতে চেয়েছি, জনগণের স্বস্তিই সরকারে