মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধটি শুরু হওয়ার সময় ট্রাম্প প্রায় এক মাসের মধ্যে এটি শেষ হবে বলে ধারণা করেছিলেন। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধকে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়া থেকে ঠেকাতে চাইছে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে চারজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নভেম্বরের ৩ তারিখের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে তুলনামূলকভাবে ‘শান্ত’ বা নিয়ন্ত্রিত রাখার পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাঁদের মধ্যে তিনজন হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা। নির্বাচনের পর প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
এই কৌশলের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক। নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে তাদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ পুনর্দখলের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাই যুদ্ধ বড় ধরনের সংবাদ ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হলে রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনী ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, “ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা হচ্ছে, তবে নভেম্বর একটি অগ্রাধিকার।”
সামরিক হামলার বদলে অর্থনৈতিক চাপ
তবে এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইরান বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করলেও ইরানের নেতৃত্বকে তাদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারেনি।
চীনও ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টায় পুরোপুরি সহযোগিতা করছে না। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
যুদ্ধ থামিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে
সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লারাক দ্বীপে রকেট উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানায়। এর পর ইরান জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েকটি ইরানি স্থাপনায় হামলা চালায়। জুলাইয়ের পর এটিকে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ওই হামলায় ইরানের সামরিক সদস্যের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছেন। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক সক্ষমতা নিয়েও চাপ
এদিকে Washington Post-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানেরা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে লিখিত মূল্যায়নে সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা টেকসই হবে না এবং অন্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে পেন্টাগনের বক্তব্য, সামরিক বাহিনীর অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে।
জনমতও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় সমস্যা
ফলে যুদ্ধ যদি আরও বড় আকার ধারণ করে এবং তেলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ে, তাহলে নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ওপর তার রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের কয়েকজন যুদ্ধের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চাইলেও সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত কমানোর জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নভেম্বর পর্যন্ত সংঘাতকে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখার ধারণার পক্ষে রয়েছেন।
তবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গিয়ে ইরান যদি সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে উল্টো নতুন করে সংঘাত বাড়তে পারে। অর্থাৎ নভেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ ‘চুপচাপ’ রাখার কৌশলটি বাস্তবায়ন করতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—তিন ধরনের চাপ সামলাতে হবে।
Source: Reuters, TRT World

কালের দাবি ডেস্ক