ঢাকা | বঙ্গাব্দ

আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ: তদন্ত প্রতিবেদন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 15, 2026 ইং
আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ: তদন্ত প্রতিবেদন ছবির ক্যাপশন: সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ফাইল ছবি
ad728

বাংলাদেশের গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার পেছনে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তই প্রধান ভূমিকা রেখেছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গত মার্চে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেন খেলতে যায়নি, তা অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। মঙ্গলবার সেই কমিটির ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওলি উল্যা। সদস্য ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর এবং সাবেক জাতীয় অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।


প্রতিবেদন প্রকাশের পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্যরা শুরুতে সরাসরি কারও নাম বলতে চাননি।

তবে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের পর ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে কমিটি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তাতে বিশ্বকাপে না যাওয়ার জন্য তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সে সময়ের সরকার দায়ী।

তিনি জানান, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিকে চিঠি দিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। বিসিবি ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করেনি।

তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে,বাংলাদেশের অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলা উচিত ছিল।


তদন্ত প্রতিবেদনে যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য তাকে ডাকার পর আসিফ নজরুল নিজেই বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে ক্রীড়া সচিব বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় বিসিবির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল প্রবল চাপের মধ্যে ছিলেন। ফলে তিনি আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেননি।

অন্যদিকে বিসিবির সাবেক সভাপতি ও সে সময়ের সহসভাপতি ফারুক আহমেদ তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলা উচিত।


তদন্ত কমিটির কাছে বক্তব্য দিয়েছেন সে সময়ের বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন।

তিনি জানান, ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। তবে সরকার যদি বিশ্বকাপে না যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ক্রিকেট বোর্ডকে সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়।

অর্থাৎ দলের খেলোয়াড় ও ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ থাকার পরও সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।


২২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্রিকেটারদের মধ্যে ছিলেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।

ক্রিকেট প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় দলের কোচ ও সে সময়ের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং বিসিবির পরিচালক নাজমূল আবেদীনের।

এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্যও নেওয়া হয়।


তদন্তের কেন্দ্রে থাকা তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সে সময়ের বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।

আসিফ নজরুলের বক্তব্য না পাওয়ায় সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তার বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন তথ্যও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।


তদন্ত কমিটি শুধু সরকারের সিদ্ধান্তকেই বিষয়টি ব্যাখ্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখেনি। প্রতিবেদনে ক্রিকেটে রাজনীতির প্রভাব, আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং বিসিবির প্রশাসনিক দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

চূড়ান্ত মূল্যায়নে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয়কে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ, আইসিসির গভর্ন্যান্স-সংক্রান্ত সংঘাত, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং ব্যর্থ আলোচনা।



তদন্ত প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি র‌্যাঙ্কিংও করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বিশ্বকাপের ভেন্যু পরিবর্তনে আইসিসির অপারগতা এবং বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপকে ‘অতি উচ্চ’ গুরুত্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিসিবির কূটনৈতিক দক্ষতার ঘাটতিকে ‘উচ্চ’ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়াকে ‘মাঝারি’ মাত্রার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্রিকেটার ও সমর্থকেরা।

প্রতিবেদনে তামিম ইকবালের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির একটি সমাধান বের করার সুযোগ ছিল।

তদন্ত কমিটি মনে করে, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কখনো একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তে নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।


তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেটকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখা, বিসিবির স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করা এবং সংকটের সময় যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো।

এ ছাড়া ক্রিকেটারদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা এবং বিসিবি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ক্রীড়া কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এই তারকারাও

প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এই তারকারাও