ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চার অভিযোগ, যেসব অপরাধের রায় হলো

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 15, 2026 ইং
ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চার অভিযোগ, যেসব অপরাধের রায় হলো ছবির ক্যাপশন: মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাত নেতার প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা চার অভিযোগ প্রমাণিত
ad728

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে।

সাত আসামিই পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন অভিযোগে তাদের সাজা আলাদা হয়েছে।


প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি, আন্দোলন দমনের নির্দেশ, অপহরণ, হত্যা ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

মামলার শুনানিতে তার বেশ কয়েকটি অডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব অডিওতে আন্দোলন দমনে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিতে শোনা যায় তাকে।

২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এরপর ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ বলে দেওয়া বক্তব্যে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।


১৫ জুলাই ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, তার বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এসব হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীসহ সারা দেশে অনেকে আহত হন।

আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।


প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের পর চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয় এবং মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুকসহ কয়েকজন নিহত হন।

একই সময়ে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের নিহত হওয়ার ঘটনাও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৭ জুলাই দলীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন দমনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়ার এবং পরদিন আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

১৯ জুলাই গণভবনে বৈঠকের পর কারফিউ ও সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বলেছিলেন ওবায়দুল কাদের—প্রসিকিউশনের অভিযোগে এই বক্তব্যকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আলী আরাফাত ও ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনা চার অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধেও আন্দোলন দমনে সমর্থন ও প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়।

১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাতেও তাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে অভিযোগে।

চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাহাউদ্দিন নাছিমকে দ্বিতীয় অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। প্রথম অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমন এবং গণমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধের অভিযোগ আনা হয়।

১৪ জুলাইয়ের গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যে সমর্থন ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া আন্দোলন দমনে সরকারের বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার খবর প্রচারের সময় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভির সংবাদ সম্প্রচার এবং ২২ জুলাই বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪-এর সম্প্রচার ৩০ মিনিটের জন্য বন্ধ করা হয়েছিল।

চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলী আরাফাতকে তৃতীয় অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। প্রথম ও চতুর্থ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং দ্বিতীয় অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে নেতৃত্ব ও হত্যাকাণ্ডে ভূমিকার অভিযোগ আনা হয়।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪ দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের কর্মকাণ্ডে তার নেতৃত্ব ও নির্দেশনার ভূমিকা ছিল।

চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, পরশকে প্রথম অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধেও চারটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাকে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে চার অভিযোগের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ একসঙ্গে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।

পুনর্গঠিত দুই ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত সাতটি মামলার রায়ে মোট ৬৮ জন আসামির সাজা হয়েছে বলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
এবার নিশানায় ইউক্রেন

এবার নিশানায় ইউক্রেন