ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তালেবান ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে কী দেখা যাচ্ছে?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 18, 2026 ইং
তালেবান ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে কী দেখা যাচ্ছে? ছবির ক্যাপশন: ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুলে প্রবেশ করে তালেবান যোদ্ধারা। ছবি:সংগৃহীত
ad728

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসে তালেবান। এরপর কেটে গেছে পাঁচ বছর। এই সময়ে দেশটির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে গোষ্ঠীটি। তবে নারীর অধিকার, শিক্ষা, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান এখনো নানা জটিলতার মধ্যে রয়েছে।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। নারীরাও ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তবে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও কিছু নারী ঘরে বা সীমিত পরিসরে কাজের সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

কাবুলের দক্ষিণের একটি গ্রামে নাজিয়া নামের এক নারী উদ্যোক্তার পরিচালিত জ্যাম তৈরির কর্মশালায় প্রায় ১২ জন নারী কাজ করছেন। কর্মশালাটি নারীদের জন্য আয় ও দক্ষতা অর্জনের একটি সীমিত সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সম্প্রতি চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পুরুষের সহায়তা নিতে হচ্ছে। বাণিজ্য মেলায় পণ্য প্রদর্শনের স্টলেও শুধু পুরুষদের বসার সুযোগ রয়েছে। তালেবান এসব বিধিনিষেধের পেছনে হিজাবসংক্রান্ত নিয়ম না মানার অভিযোগকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।


নারীদের শিক্ষা ও জনজীবনে বিধিনিষেধ

তালেবান শাসনের পাঁচ বছরে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। মেয়েদের মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ থাকায় দেশটির নারী ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

কাবুলের নারী অধিকারকর্মী মেহবুবা সিরাজের একটি আশ্রয়কেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা ৩০ জনের বেশি নারী আশ্রয় পেয়েছিলেন। নারীদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর আবেদনও তালেবান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সাড়া পায়নি।

তবে কিছু এলাকায় আন্তর্জাতিক ও আফগান সহায়তা সংস্থাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার মাধ্যমে নারীদের সীমিতভাবে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কোথাও নারীরা বাড়ি থেকে কাজ করছেন, আবার কোথাও পুরুষ সহকর্মীদের থেকে আলাদা জায়গায় কাজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।


অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট

তালেবান শাসনের পাশাপাশি আফগানিস্তান গুরুতর অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্যেও রয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটির প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ মানুষ—অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক—জীবনধারণের জন্য কোনো না কোনো ধরনের বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত বিপুলসংখ্যক আফগানও দেশে ফিরে এসেছেন।

অন্যদিকে তালেবান রাজস্ব আদায় করছে এবং চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তানের মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে খনি, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে চুক্তি করছে। তবে সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপও রয়েছে।


আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক

তালেবান এখনো ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। রাশিয়াই একমাত্র দেশ, যে তালেবান শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আফগান দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তালেবানের হাতে যাচ্ছে। ৪০টির বেশি আফগান দূতাবাস তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ মনে করেন, সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে দেশগুলোর আরও কাছাকাছি আসা প্রয়োজন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে—তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে তাদের নীতিতে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না।


সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে জাতিসংঘ

আফগানিস্তানকে পুরোপুরি আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে জাতিসংঘ। গত পাঁচ বছরে তালেবানের সঙ্গে তাদের অনিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে। বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, নৈতিক বিধির প্রয়োগ এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর মতো বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।

বর্তমানে ‘মোজাইক’ নামে একটি প্রক্রিয়ার আওতায় মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমসহ ছয়টি বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে তালেবান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা তহবিল মুক্ত করা এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি চায়।

তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এ ধরনের আলোচনায় তালেবানের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি হচ্ছে না। নারী অধিকারকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, তালেবান দৃশ্যমান পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত আলোচনার পরিধি মানবিক সহায়তার বাইরে বাড়ানো উচিত নয়।


পরিবর্তনের সম্ভাবনা কোথায়?

তালেবানের কিছু কর্মকর্তা মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ রাখাসহ সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। খুব সীমিত কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নির্দেশগুলো তালেবানের মধ্যে চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানে দ্রুত পরিবর্তনের কোনো সহজ পথ দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যেমন মত রয়েছে, তেমনি তালেবানের ওপর আরও কঠোর ও সমন্বিত চাপ প্রয়োগের দাবিও রয়েছে।

তবে আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা এক পশ্চিমা বিশ্লেষকের মতে, প্রকৃত পরিবর্তনের চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেই নিহিত।

তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্তিতে আফগানিস্তানের চিত্র তাই একদিকে শক্তিশালী তালেবান নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে নারীদের অধিকার সংকোচন, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সমন্বিত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে।

সূত্র: BBC Bangla


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকঃ মাধ্যমি

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকঃ মাধ্যমি