রয়টার্স:
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানের পক্ষে সহজে অর্থ লেনদেন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে সুইফটের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে মার্কিন নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে ইরান ও চীন এমন একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যা অনেকটা পণ্য বিনিময় বা ‘বার্টার’ ব্যবস্থার মতো। ইরান চীনে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করে নগদ ডলার নেওয়ার বদলে চীনে একটি বিশেষ হিসাব বা তহবিলে নিজেদের নামে অর্থের সমপরিমাণ ‘ক্রেডিট’ জমা রাখে।
পরবর্তী সময়ে ইরান চীন থেকে যন্ত্রাংশ, গাড়ি, ওষুধ, যোগাযোগ সরঞ্জাম কিংবা অন্য পণ্য কিনলে সেই ক্রেডিট থেকেই অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরাসরি ডলার স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়ে না।
এই ব্যবস্থাকে একটি শপিং মলের উপহার কার্ডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কোনো ব্যক্তি যেমন আগে থেকে কার্ডে অর্থ জমা রেখে পরে ওই অর্থ দিয়ে পণ্য কেনেন, ইরানও তেলের বিনিময়ে চীনে জমা হওয়া ক্রেডিট ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলোর দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ওষুধ, যানবাহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম পেয়েছে। এসব পণ্যের নির্মাতারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা না করায় তাঁদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
গত এক বছরে কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের একটি চুক্তিতেও একই ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা জানিয়েছে সূত্রগুলো। তবে সংশ্লিষ্ট চীনা নির্মাতাদের পরিচয় বা ওই চুক্তির বাস্তবায়ন স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে এমন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠান বা এসপিভির তথ্যও এসেছে, যার মাধ্যমে ইরান-চীনের বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
তিনটি সূত্রের হিসাবে, গত এক বছরে এই এসপিভির মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলার লেনদেন হয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেল বিক্রির অর্থের একটি বড় অংশ চীনে অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ এ ধরনের প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। বাকি অর্থ এসপিভিতে রাখা হয়, যা ইরানে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়।
তবে রয়টার্স চীনের কোম্পানি নিবন্ধনসংক্রান্ত নথিতে ‘চুইশিন’ নামে কথিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। একইভাবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করে বলে যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা সূত্রগুলো জানিয়েছে, সেগুলোরও প্রকাশ্য নথি পাওয়া যায়নি।
এ কারণে রয়টার্স জানিয়েছে, এই ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের তেল কেনার ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। দেশটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে।
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি তেল তুলনামূলক কম দামে পাওয়ার সুযোগও চীনের জন্য অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়।
অন্যদিকে ইরান চীনা পণ্য পাওয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ সামলানোর সুযোগ পাচ্ছে। ফলে দুই দেশের জন্যই এই বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থার অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কয়েকটি ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন তুলনামূলক সতর্ক।
গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোকে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। অন্যথায় তাদের ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের পথ বন্ধ করা যায়।
তবে রয়টার্স যে নির্দিষ্ট গোপন বাণিজ্যব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করেছে, সেটি নিয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়।
তবে চীন দীর্ঘদিন ধরে একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে। বেইজিংয়ের ভাষ্য, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেই—এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার আন্তর্জাতিক আইনে ভিত্তি নেই।
ইরানও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে মনে করে এবং চীনের সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলে আসছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা তিনটি সূত্রের দাবি, এই বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা অন্তত ২০২১ সাল থেকে চালু রয়েছে। প্রথমদিকে এর মাধ্যমে ইরানে ওষুধ ও কোভিড-১৯ টিকা সরবরাহ করা হতো।
পরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মার্কিন চাপ বাড়তে থাকায় ব্যবস্থাটির গুরুত্বও বেড়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসে। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের ওপর জাতিসংঘের কিছু প্রচলিত অস্ত্রসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল হয়।
এর মধ্যেই চীন ও ইরান নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্বের চুক্তি করেছিল, যেখানে জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে চাইছে যে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে বেইজিংয়ের ওপর সহজে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
তবে তাঁর মতে, চীনা নেতারাও চান না দেশটির বড় ব্যাংক বা কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ুক। তাই এমন একটি ব্যবস্থা কার্যকর রাখা হচ্ছে, যেখানে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান-চীন বাণিজ্যের এই ব্যবস্থা শুধু নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল নয়; এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি বিকল্প কাঠামোও তৈরি করেছে। তবে এর প্রকৃত পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ব্যবহারের বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।

কালের দাবি ডেস্ক