ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সাত বছর পর ভারতে শি জিনপিং, কী বার্তা দিচ্ছে এই সফর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 11, 2026 ইং
সাত বছর পর ভারতে শি জিনপিং, কী বার্তা দিচ্ছে এই সফর ছবির ক্যাপশন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
ad728


দীর্ঘ সাত বছর পর ভারত সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেবেন তিনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০১৯ সালে সর্বশেষ ভারত সফরে এসেছিলেন শি। সে সময় চেন্নাইয়ের কাছে মামাল্লাপুরমে মোদীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

এবারের সফরকে তাই চীন-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চলমান প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের ভেতরে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।


২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ওই ঘটনায় ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। চীন পরে তাদের চার সেনা নিহত হওয়ার কথা জানায়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রায় পাঁচ বছর পর মোদী ও শি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করেন। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো এবং লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি-সংক্রান্ত বিরোধের সমাধানে দুই পক্ষের উদ্যোগকে সে সময় স্বাগত জানানো হয়।

গত বছরও মোদী চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বৈঠকে অংশ নেন এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।


বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও সীমান্ত বিরোধ পুরোপুরি মিটে যায়নি। দুই দেশের মধ্যে এখন মূল লক্ষ্য হলো সীমান্তে নতুন করে বড় কোনো সংঘাত যাতে না ঘটে এবং ধীরে ধীরে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা।

চলতি মাসের শুরুতে ভারত ও চীনের সিনিয়র সামরিক কমান্ডার পর্যায়ে সীমান্তে ফ্ল্যাগ মিটিং হয়েছে। এর আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়েছে এবং ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াতেও কিছুটা শিথিলতা এসেছে।


চীন-ভারত সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত চীনা বিনিয়োগের ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। ইলেকট্রনিকস, মূলধনী পণ্য ও সৌরশক্তি খাতসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগও বাড়ছে।

ভারতের ডিক্সন টেকনোলজিস ও চীনের ভিভো মোবাইলের যৌথ উদ্যোগসহ কিছু প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে নয়াদিল্লি।

তবে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো বাধা রয়েছে। বিওয়াইডি ও গ্রেট ওয়াল মোটরের মতো চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে।

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারতীয় বাজারে প্রবেশ এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত উদ্বেগ এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে।


চীন ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের লক্ষ্য শুধু চীন থেকে পণ্য আমদানি করা নয়; বরং চীনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং উৎপাদন খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে চীনের জন্য ভারত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে ভারতের বিশাল বাজার চীনা অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।


বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের সফরে চীন দুই দেশের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে পারে।

চীনের পক্ষ থেকে ভারতীয় পণ্যের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। অন্যদিকে ভারত চীনা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে আরও সুবিধা চাইতে পারে।

তবে রাতারাতি দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সীমান্ত বিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিনিয়োগের বিধিনিষেধ ও বাণিজ্য ঘাটতির মতো বিষয়গুলো এখনো বড় বাধা।


চীন-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ও শুল্কসংক্রান্ত চাপ ভারত ও চীন—উভয় দেশকেই নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ খুঁজতে বাধ্য করছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারত ও চীন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ দেখতে পারে। তবে কৌশলগতভাবে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।

সব মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফর চীন-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।

মোদী ও শির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হলে সীমান্ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে কথার পাশাপাশি বাস্তবে বাণিজ্যিক ও সীমান্তসংক্রান্ত বাধাগুলো কতটা কমানো যায় তার ওপর।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মাশহাদে সমাহিত আয়াতুল্লাহ খামেনি, লাখো মানুষের শেষ শ্রদ্ধা

মাশহাদে সমাহিত আয়াতুল্লাহ খামেনি, লাখো মানুষের শেষ শ্রদ্ধা