ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, চাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 19, 2026 ইং
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, চাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ ছবির ক্যাপশন: যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় ও খরার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ad728

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়ায় ফসল উৎপাদন কমে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আগামী কয়েক মাসে আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেছেন, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। চলতি বছরের শেষ ভাগ থেকে আগামী বছরের শুরু এবং পুরো ২০২৭ সালজুড়েও এ চাপের প্রভাব পড়তে পারে।

এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে খাদ্যের দাম বাড়ায় উদ্বেগ বেশি। এসব অঞ্চলের অনেক পরিবার আয়ের বড় অংশ খাবার কেনার পেছনে ব্যয় করে। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ১৫০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে—জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—২২ শতাংশ দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছায়, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য রপ্তানিসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে হামলার কারণে গম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এতে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। একই সময়ে লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহনের সময় ও খরচ—দুটিই বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ববাজারে গমের দাম আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরে কিছুটা কমলেও এখনো তা বেশি রয়েছে।

খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামের প্রভাব বিভিন্ন দেশের বাজারে ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। মিসরে ভর্তুকি ছাড়া বড় আকারের একটি রুটির দাম জুলাইয়ে ৪ মিসরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় ৫ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ায় এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেছেন, পণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠছে। মিসরের কায়রোর এক বেকারি ব্যবসায়ী সাঈদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ময়দা নয়—শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট ও রুটি তৈরির অন্যান্য উপকরণের খরচও বেড়েছে।

জ্বালানি ও যুদ্ধজনিত কারণে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছিল। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে আসা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফসল পাওয়ায় কিছু সময় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্য কেনা কমিয়ে রেখেছিল। এখন তাদের আবার আমদানিতে ফিরতে হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে চাহিদা দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেক্সান্ডার কারাভাইতসেভের মতে, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকেরা বাজারে ফিরলে চাহিদার নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে। এফএওর তোরেরো বলেছেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত এত দিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিলেও সেই সুরক্ষা ক্রমে কমছে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। এসব চুক্তি নবায়নের সময় এখন বেশি দাম দিতে হচ্ছে। আমদানিকারক দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রার মান কমে গেলে বিদেশ থেকে খাদ্য ও কাঁচামাল কেনার ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

ইন্দোনেশিয়ার বড় খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং বলেছেন, পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি এবং রুপিয়ার মান কমে যাওয়ায় কোম্পানির ব্যয় আরও বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বেশি দাম দিয়েও কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে গম আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার টনে নেমেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় দেশটির কয়েকটি গমকল উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে বলে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

তবে আপাতত সয়াবিন ও ভুট্টার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতে এ দুটি শস্যের সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর নির্ভর করবে। জৈব জ্বালানি তৈরিতে এসব শস্যের ব্যবহার বাড়ায় খাদ্য ও জ্বালানি খাতের চাহিদার মধ্যে প্রতিযোগিতাও সরবরাহ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

খাদ্যপণ্যের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
ভিনিসিয়াসকে ছাড়তে প্রস্তুত রিয়াল মাদ্রিদ

ভিনিসিয়াসকে ছাড়তে প্রস্তুত রিয়াল মাদ্রিদ